আজ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’। প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহের অবসান এবং নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের এক প্রত্যয়ী আহ্বান। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা ও স্বপ্নের রংতুলি, সে বয়সে তার হাতে সংসারের বোঝা তুলে দেওয়া কোনোভাবেই সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
কন্যাশিশু পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ। তার মধ্যেও রয়েছে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। কিন্তু বাল্যবিবাহ সেই সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করে দেয়। অকালবিবাহের কারণে বহু কন্যাশিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকিতে পড়ে এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বাভাবিক সুযোগ হারায়। অনেকের জীবনে নেমে আসে নির্ভরশীলতা, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া। অথচ যথাযথ শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সুযোগ পেলে তারাই পরিবার ও দেশের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন, নীতিমালা ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ থাকলেও সমস্যাটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা, যৌতুকের চাপ এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা এখনো অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতেও কোনো কোনো পরিবার মেয়েদের বিয়েকে নিরাপত্তার উপায় বলে মনে করে। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ।
কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং তাকে শিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী করে তোলাই প্রকৃত দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় বৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহের খবর পেলে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন এবং অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কন্যাশিশুকে করুণার পাত্র নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা। তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা দিতে হবে এবং নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের শিক্ষা কেবল একজন ব্যক্তির জীবন বদলায় না; তা বদলে দিতে পারে একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং একটি সমাজের ভবিষ্যৎ।
জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—কোনো কন্যার শৈশব যেন বিয়ের পিঁড়িতে হারিয়ে না যায়, কোনো স্বপ্ন যেন সামাজিক বাধায় থেমে না থাকে। বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ কন্যাশিশুকে এগিয়ে দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়, তার ন্যায্য অধিকার। শিশু বিয়ে বন্ধ হলে, শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হলে এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে কন্যারাই জয় করবে বিশ্ব। তাদের অগ্রযাত্রাতেই রচিত হবে সমৃদ্ধ, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।