বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিশ্ব বসতি দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত আবাসন, জলাবদ্ধতা, যানজট, বায়ুদূষণ, খাল-বিল ও জলাধার দখল এবং সবুজ উন্মুক্ত স্থান কমে যাওয়ার কারণে শহরগুলো ক্রমেই বসবাসের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়লেও নাগরিক সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে একদিকে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিসর।
আবাসন সংকটের আরেকটি নির্মম দিক হলো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের বাস্তবতা। শহরে কাজের সুযোগ থাকলেও তাদের বড় একটি অংশ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি, অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা এবং নানা ধরনের সামাজিক অনিরাপত্তার মধ্যে জীবন কাটান। অথচ একটি উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ—তার ওপরও নির্ভর করে।
পরিকল্পিত নগরায়ণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শহর পরিকল্পনায় আবাসনের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, গণপরিবহন, খেলার মাঠ, পার্ক, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু নতুন শহর নির্মাণ নয়, বিদ্যমান শহরগুলোকেও বাসযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়, কঠোরভাবে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দখল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। একই সঙ্গে আবাসন খাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের সক্ষমতা বিবেচনায় বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু কাগজে পরিকল্পনা নয়, তার বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব বসতি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, শহর হবে মানুষের বসবাসের জন্য। এমন বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে একজন মানুষ শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চলাচলের সুযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের নাগালসহ একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ পাবেন।
বাসযোগ্য বসতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের অধিকার। আজকের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কেমন শহর ও সমাজে বাস করবে। তাই উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় শুধু ভবনের উচ্চতা নয়, মানুষের জীবনমানকেই করতে হবে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড। সবার জন্য নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বসতি গড়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে সত্যিকারের মানবিক বাংলাদেশ।