আজ বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস। পণ্য ও সেবার মান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘Shared vision for a better world—Affordable and Clean Energy’, যার ভাবার্থ ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’। প্রতিপাদ্যটি আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরস্পরের পরিপূরক।
মান কেবল কোনো পণ্যের গুণগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের মাপকাঠি নয়; এটি ভোক্তার আস্থা, উৎপাদকের দায়িত্বশীলতা এবং একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতারও পরিচায়ক। খাদ্য থেকে ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী থেকে প্রযুক্তিপণ্য কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে ডিজিটাল সেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মানহীন পণ্য ও সেবা মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থের ক্ষতি করে; অন্যদিকে মানসম্মত উৎপাদন বাজারে আস্থা বাড়ায়, অপচয় কমায় এবং দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেয়।
এবারের প্রতিপাদ্যে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যথার্থ কারণেই। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, অথচ জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণকে তীব্র করছে। এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। তবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। কিন্তু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপ, উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রসার এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই, বাজার তদারকি এবং মানবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। শুধু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না; সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের মানসম্মত পণ্য সরবরাহের দায়িত্ব নিতে হবে, আর ভোক্তাদেরও পণ্যের মান, নিরাপত্তা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য এখানেই—উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে মানের কোনো বিকল্প নেই। সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও ভোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মান হবে উন্নয়নের ভিত্তি, জ্বালানি হবে সাশ্রয়ী এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি হবে পরিবেশবান্ধব। আজকের অঙ্গীকার হোক, মানসম্মত পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার ঘটানো। কারণ উন্নত বিশ্ব নির্মাণের অভিন্ন লক্ষ্য পূরণে মান, জ্বালানি ও পরিবেশ—এই তিনের সমন্বয়ই হতে পারে টেকসই সমৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি।