সম্পাদকীয়: বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং এমনকি শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার মতো ভয়াবহ ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকারকর্মী, গণমাধ্যম এবং বেসরকারি সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশিত তথ্যে নারীর প্রতি সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
প্রশ্ন হলো—এত তথ্য, এত আইন, এত আলোচনা এবং এত প্রতিশ্রুতির পরও পরিস্থিতির কেন দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না?
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইন কম নেই। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। শিশু সুরক্ষায়ও রয়েছে একাধিক আইন ও নীতিমালা। কিন্তু আইনের কঠোরতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা, তদন্ত, গ্রেপ্তার, বিচার ও শাস্তির পুরো প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত, প্রভাবশালী মহলের চাপ কিংবা প্রশাসনিক উদাসীনতায় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে কাগজে থাকা কঠোর আইন বাস্তবে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোথাও মামলা নিতে গড়িমসি, কোথাও তদন্তে ধীরগতি, কোথাও অভিযুক্তের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে চাপ সৃষ্টি—এ ধরনের অভিযোগ নিয়মিতই সামনে আসে। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা অবশ্যই উচিত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগকারী নারী বা শিশুকে অবিশ্বাস করা, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে প্রশাসনিক বাধা তৈরি করাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জার। যে শিশু নিজের নিরাপত্তার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, সেই শিশুই যদি যৌন সহিংসতার শিকার হয়, তাহলে শুধু অপরাধীর দায় নয়—আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে আসে। একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে না পারলে উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় বড় পরিসংখ্যানও আমাদের মানবিক সাফল্যের পূর্ণ চিত্র দিতে পারে না।
এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ প্রতিরোধ শুধু অপরাধ সংঘটনের পর আসামি গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষ তদন্ত, ডিজিটাল ও ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের আওতায় আনা—এসবই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ধর্ষণ বা নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বছরের পর বছর বিচার চলতে থাকলে ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবার মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে অপরাধীর কাছে তৈরি হয় দায়মুক্তির অনুভূতি। তাই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি তদন্তের মানও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার মানে তড়িঘড়ি বিচার নয়; বরং নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও সময়সীমাবদ্ধ বিচার।
সরকারের কাছে আমাদের সরাসরি প্রশ্ন—নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে? যদি থাকে, তাহলে প্রতিদিনের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন কোথায়?
শুধু ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলন, উদ্বেগ প্রকাশ কিংবা কঠোর শাস্তির আশ্বাস দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি। কোনো এলাকায় ধারাবাহিকভাবে নারী নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে মূল্যায়ন হওয়া উচিত। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তবে দায় শুধু সরকারের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর পোশাক, চলাফেরা বা জীবনযাপনকে দায়ী করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণের দায় কখনো ভুক্তভোগীর নয়; দায় অপরাধীর। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমারেখা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং যৌন হয়রানি সম্পর্কে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সোপযোগী সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা কিংবা সংবেদনশীল ঘটনাকে চটকদারভাবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সংবাদ হতে হবে এমন, যা অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরবে কিন্তু ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা নষ্ট করবে না।
বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি সংবিধান ও আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র তখনই নিজেকে সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করতে পারে, যখন তার নারী ও শিশুরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, অন্যায়ের শিকার হলে নির্বিঘ্নে অভিযোগ করতে পারে এবং নিশ্চিত থাকতে পারে যে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি।
আজ যদি নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, আগামী দিনে তার সামাজিক মূল্য দিতে হবে আরও ভয়াবহভাবে। তাই সরকারের উচিত পরিসংখ্যান প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সমন্বিত সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আজই কঠোর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী দিনের বাংলাদেশ আরও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। আর সেই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রের কারও নেই।