নেপালে বুধবারের আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত ৪৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগের পরও বিদেশি নাগরিকসহ ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও নেপাল তা গ্রহণ করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই; নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম।
শুক্রবার নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বর্তমানে দেশটির বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থানের পেছনে দেশটির অতীত অভিজ্ঞতাও ভূমিকা রেখেছে বলে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে নেপালকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। আরও অনেক দেশ তল্লাশি, উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া জেলাসহ নেপালের বেশ কয়েকটি এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের কয়েকজন নাগরিক নিখোঁজ থাকায় দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে নেপালে একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। দেশটি ত্রাণবাহী দলও পাঠাতে চায় বলে জানিয়েছে। তবে শুক্রবার নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, দেশটি আপাতত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, বিদেশি দেশগুলোর পক্ষ থেকে সহায়তার প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে নেপালের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে এবং আপাতত এ ধরনের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণে অনীহার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো কারণ জানাননি।
নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার নয়জন নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে সিউল সহায়তার প্রস্তাব দিলেও নেপাল জানিয়েছে, এই মুহূর্তে বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণের পরিকল্পনা তাদের নেই।
কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল নেপালে পাঠানোর অনুমতির জন্য ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণে নেপালের অনীহার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে রয়টার্স জাতিসংঘে নেপালের সাবেক রাষ্ট্রদূত দিনেশ ভট্টরাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁর ধারণা, রাসুওয়া জেলার ভৌগোলিক অবস্থান এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত এই জেলা চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তবর্তী।
দিনেশ ভট্টরাই বলেন, এলাকার স্পর্শকাতর ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নেপাল সরকার হয়তো বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী এ ধারণা নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্তটির সঙ্গে চীনের কোনো স্পর্শকাতরতার সম্পর্ক নেই। নেপালের নিজস্ব উদ্ধারকারী দলই বর্তমানে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করছে।
বার্তা সংস্থা এএফপিও জানিয়েছে, বন্যার পর শুক্রবার নেপাল আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তবে দেশটি আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা ছাড়াই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোর দিচ্ছে।
এএফপিকে লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, এই মুহূর্তে নেপালের প্রধান অগ্রাধিকার অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এ ধরনের অভিযান পরিচালনায় সক্ষম। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা চাইতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এমন নয় যে নেপালের কোনো ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী সক্ষমতা অনুযায়ী কার্যকরভাবে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অর্থ সহায়তার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তহবিল চেয়ে আবেদন করেছে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে নেপালকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
নেপালের কর্মকর্তারা বলছেন, তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান বর্তমানে নিজস্ব বাহিনীর মাধ্যমেই পরিচালিত হবে। পরে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনপর্বে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি ও কাঠমান্ডু পোস্ট।