ঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০২৬: রাজধানীর বারিধারায় ফ্ল্যাট বিক্রির নামে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার মামলায় দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে জামিন দেননি আদালত। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদ শুনানি শেষে তার জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে গত ২০ মে বিদিশার অনুপস্থিতিতে মামলাটির রায় ঘোষণা করেন আদালত। প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। রায় ঘোষণার সময় বিদিশা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্তোরাঁ থেকে বিদিশা সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করে গুলশান থানা-পুলিশ। পরে বুধবার বেলা ১১টার দিকে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় পুলিশ তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানায়।
শুনানির সময় বিদিশাকে এজলাসে তোলা হয়নি। তাকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। তার পক্ষে আইনজীবী আতিকুর রহমান উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রেখে বিশেষ বিবেচনায় জামিন দেওয়ার আবেদন করেন। তিনি আদালতকে জানান, এ মামলার কার্যক্রমের ওপর আগে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল, যা পরবর্তী সময়ে প্রত্যাহার করা হয়। তার দাবি, বিদিশার অনুপস্থিতিতেই মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে রায় দেওয়া হয়েছে।
তবে জামিনের বিরোধিতা করেন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান এবং রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ গোলাম মর্তুজা ইবনে ইসলাম। বাদীপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, মামলাটি প্রায় আড়াই দশক পুরোনো হলেও বিদিশা আদালতের কার্যক্রমের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাননি। সমন ও মামলার কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত থাকার পরও তিনি দীর্ঘ সময় আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর বিচারক বিদিশার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার নথি ও অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, রাজধানীর বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির কথা বলে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালে গুলশান থানায় মামলাটি করেন ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন সিকদার।
মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে যোগাযোগের সূত্র ধরে ২০০১ সালের ১ জুলাই বিদিশার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই সময় বিদিশা তাকে প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট দেখিয়ে ৮০ লাখ টাকায় সেটি বিক্রির প্রস্তাব দেন।
এরপর একই বছরের ১০ জুলাই বনানীর রজনীগন্ধা কার্যালয়ে বাদীকে ডেকে তার মনোনীত প্রতিনিধি ও বন্ধু আব্দুল রাজ্জাকের নামে ৭৫ লাখ টাকার একটি পে-অর্ডার গ্রহণ করেন বিদিশা। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে ওই অর্থ পরিশোধের পর উভয় পক্ষের মধ্যে একটি বায়নানামা সম্পাদিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন পাওয়ার পর বাকি অর্থ পরিশোধ করে ২০০২ সালের ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ফ্ল্যাটটি ক্রেতার কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে বাদী টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিলে ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিদিশা তাকে ৭২ লাখ টাকার একটি চেক দেন বলে মামলায় বলা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেকটি নগদায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং তা বাউন্স হয়ে যায়।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, এরপরও বিদিশা ফ্ল্যাট বা টাকা কোনোটিই ফেরত দেননি। বরং বাদীকে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই পরে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে গড়ায় এবং চলতি বছরের ২০ মে আদালত তার বিরুদ্ধে দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় দেন।
সূত্র: আদালত সূত্র।