শ্রীলঙ্কা ও ভারতের তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য মায়েদের অংশগ্রহণে রান্না করা খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এ লক্ষ্যে খুব শিগগিরই রান্না করা খাবার সরবরাহের একটি পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে।
বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহীদ সাটু হলে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্প সম্পর্কে প্রধান শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত পাইলট কার্যক্রমে স্থানীয় বাজার থেকে শাকসবজি, ডিম, মাছসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করা হবে। এরপর মায়েদের সরাসরি দায়িত্বে খাবার রান্না ও শিশুদের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এভাবে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিভিন্ন সম্ভাব্য মডেল পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, খাবার সরবরাহের পদ্ধতি একাধিক হতে পারে, কিন্তু সরকারের প্রধান লক্ষ্য একটি—প্রতিটি শিশুর কাছে যথাসময়ে নিরাপদ, মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়া। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করাও এ ধরনের কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।
মিড-ডে মিল কর্মসূচির বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, মাদারস কমিটির কার্যকর নজরদারির কারণে মিড-ডে মিল প্রকল্পে অনিয়ম ও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্থানীয় পর্যায়ে মায়েদের সরাসরি সম্পৃক্ততার ফলে খাবারের মান যাচাই, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাদারস কমিটিকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খাবারের গুণগত মান, গন্ধ, স্বাদ কিংবা সরবরাহে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সেই খাবার প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। মায়েদের এই সরাসরি অংশগ্রহণের ফলে মিড-ডে মিল কর্মসূচি আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠছে।
প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো—কোনো শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে থাকবে না এবং প্রত্যেক শিশুকে মানসম্মত শিক্ষা দিতে হবে। এই লক্ষ্য দুটির বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, শিশুদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, এমন ব্যবস্থা করা হচ্ছে যাতে শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ নিতে না হয়। কারণ দীর্ঘ সময় শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে সেখানে শিক্ষক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া শিক্ষকদের মূল্যায়নভিত্তিক পদোন্নতি, নতুন বদলি নীতি এবং পেশাগত দক্ষতা ও উন্নয়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। দুর্গম অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের সুবিধার বিষয়টিও নতুন নীতিমালায় গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ভিত্তিক দুর্গম ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় শূন্য পদ পূরণ এবং প্রধান শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাইটগার্ড ও এমএলএসএসসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল নিয়োগের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে দেশের কিছু বিদ্যালয় বারবার স্থান পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকে। এসব এলাকায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি স্থানান্তরযোগ্য অবকাঠামোর মডেল নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত বিভিন্ন অবকাঠামোগত মডেল পর্যালোচনা করে সেগুলো সরকারি ব্যবস্থায় কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সঠিক পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, শুধু একটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলেই শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, দক্ষ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক নিশ্চিত করা, কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। এ পাঁচটি ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করাই প্রাথমিক শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের প্রধান চাবিকাঠি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশীদ এবং ফিডিং কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল আমিন। অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।