ঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০২৬: বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন ও দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করতে চীনের কাছ থেকে ২০টি সর্বাধুনিক ‘জে-১০সিই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিমান, প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, লজিস্টিকস, অবকাঠামো, বিমা ও করসহ পুরো ক্রয়প্রক্রিয়ায় সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।
এ লক্ষ্যে গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি ইতোমধ্যে একটি খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করেছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এ উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরে ২০টি যুদ্ধবিমান সংগ্রহে এই সমন্বিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের মূল মূল্য ৬২ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে বিমান কেনার মূল দামের সঙ্গে বিভিন্ন সহায়ক ব্যয় যুক্ত হওয়ায় কার্যকরভাবে প্রতিটি যুদ্ধবিমানের জন্য ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবিত ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে ১০টি বিমান বিমানবাহিনীর ‘টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট’ বা টিওঅ্যান্ডই-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাকি ১০টি এর বাইরে থাকবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএটিআইসি)-এর সঙ্গে সরাসরি ক্রয় চুক্তি সই করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের অর্থ পরিশোধের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরের বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল যুদ্ধবিমানের দামের পাশাপাশি বৈমানিক ও প্রকৌশলীদের দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল সামগ্রী, কারিগরি সহায়তা, লজিস্টিক সহায়তা এবং ফ্রেইট বাবদ আরও ৮৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হবে। এর বাইরে ভ্যাট, বিমা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত পূর্তকাজের জন্য ১৫৮ মিলিয়ন ডলার এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ট্যাংক সংগ্রহে আরও ২ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জাহেদ উর রহমান বলেন, যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দর-কষাকষি শেষে খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য এটি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
জে-১০সিই নির্বাচনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি রাফালের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, রাফালকে ৪.৫ প্রজন্মের অত্যন্ত আধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাফালের বিপরীতে চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমান উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। একই সঙ্গে সমমানের ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমানের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জনগণের প্রতিরক্ষা ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। শুধু যুদ্ধবিমান সংগ্রহ নয়, বিমানবাহিনীর সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি ড্রোন সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
জে-১০সিই সংগ্রহের উদ্যোগের পেছনে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ধারাবাহিকতাও রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে বিমানবাহিনী প্রধানকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ক্রয়প্রক্রিয়াটি আরও এগিয়ে যায়।
চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে যুদ্ধবিমান ক্রয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা করে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
চীনের তৈরি একক ইঞ্জিন ও একক আসনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ হলো জে-১০সিই। সুপারসনিক গতির এ বহুমুখী যুদ্ধবিমান আকাশপথে যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। নজরদারি এবং শত্রুর রাডার ব্যবস্থায় আক্রমণ পরিচালনার সক্ষমতাও রয়েছে বলে এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার পাশাপাশি ড্রোনের সঙ্গে সমন্বয় করেও অভিযান পরিচালনা করতে পারে বিমানটি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জে-১০সিই যুক্ত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, চীনের জে-১০সি তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে এবং ব্যয়ের দিক থেকেও এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
তবে তিনি মনে করেন, এত বড় সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা মূল্য বিবেচনা করলেই হবে না। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও চুক্তির বিষয়গুলোও বিবেচনায় রেখে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।