আজ আন্তর্জাতিক যুব দিবস। বিশ্বের নানা প্রান্তে তরুণদের সম্ভাবনা, অধিকার, দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন এটি। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতি বছর ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত হয়। তবে দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা, আলোচনা কিংবা সেমিনারে সীমাবদ্ধ রাখার দিন নয়; বরং তরুণদের সামনে বিদ্যমান সুযোগ ও সংকট নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা পুনর্বিবেচনার দিন।
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তারুণ্য মানে শুধু বয়সের একটি পর্যায় নয়; এটি উদ্যম, সৃজনশীলতা, সাহস, স্বপ্ন ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারক। তাই তরুণদের সম্ভাবনাকে অবহেলা করা মানে একটি দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই দুর্বল করে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু তরুণ এখন নানা সংকটে রয়েছে। শিক্ষা শেষ করেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, দক্ষতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার মিল নেই, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে মানসিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, মাদক, সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তরুণদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতি।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে যেমন বড় সম্ভাবনা, অন্যদিকে যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে তা বড় চ্যালেঞ্জেও পরিণত হতে পারে। তরুণদের হাতে যদি দক্ষতা, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং সৃজনশীলতার সুযোগ তুলে দেওয়া যায়, তাহলে তারাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। আর যদি তাদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে সেই জনমিতিক সুবিধা ধীরে ধীরে বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে যুব উন্নয়নকে কেবল চাকরি দেওয়ার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত নীতি, যেখানে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের তরুণদের সুযোগের বৈষম্য কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে তরুণদের জন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, রোবোটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল কনটেন্ট, সবুজ প্রযুক্তি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কেবল ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহারকারী থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবকে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে তরুণদের কণ্ঠস্বরকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ থাকবে না—এমন বাস্তবতা বদলাতে হবে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিবেশ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তরুণদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয় তাদেরই।
আন্তর্জাতিক যুব দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—তরুণদের জন্য বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। তাদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিতে হবে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দক্ষতা দিতে হবে এবং ব্যর্থ হলেও আবার উঠে দাঁড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত ও সমাজ—সব পক্ষকে এ দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
আজকের তরুণরা শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়; তারা বর্তমানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের শক্তি, মেধা ও সৃজনশীলতাকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু জনসংখ্যার দিক থেকে তরুণ দেশ থাকবে না, বরং দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বেও তরুণদের শক্তিতে এগিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক যুব দিবসে তাই প্রত্যাশা—তরুণদের নিয়ে শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হোক। তাদের হাতে সুযোগ তুলে দেওয়া হোক, কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া হোক এবং স্বপ্নকে বাস্তব করার পথ তৈরি করা হোক। কারণ আজকের তরুণের হাতেই আগামী দিনের বাংলাদেশ এবং আগামীর বিশ্ব।