শিরোনাম :
নবারুণ অরুণ প্রভায় জাপানে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব: শামা ওবায়েদ বিহারের সিওয়ানে বাজি তৈরির কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ: দুই শিশুসহ নিহত বেড়ে ৫ ফিলিপাইনে প্রশিক্ষণের সময় মাঝআকাশে দুই সামরিক বিমানের সংঘর্ষ, ৪ পাইলট নিহত বিশ্ব শান্তিরক্ষা ও সমন্বিত অগ্রযাত্রায় চীনের ‘নতুন দীর্ঘ মার্চ’ বিশ্বমঞ্চে ইতিবাচক চালিকাশক্তি চীন-কেনিয়া দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বে নতুন গতি: সিএমজির বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্পিকার সম্পাদকীয় : লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার: সাধারণের দীর্ঘশ্বাস ও কাঠামোগত ব্যর্থতা দিল্লি পুলিশের শান্তি মুচলেকায় সই করতে অস্বীকৃতি আইসা সভানেত্রী নেহা বোরার পাঁচ বছরে পেনশন ব্যয় দ্বিগুণের শঙ্কা: চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থার সুপারিশ বেতন কমিশনের বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকির সতর্কতায় টানা ৩ দিন বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

ইয়াসমিন হত্যা দিবস :ধর্ষণের পর হত্যায় ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি, সাত মাসেই নিহত ৫৮

জার্মান-বাংলা ডেস্ক, ঢাকা অফিস:
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদে ধর্ষণের পর নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত বছরজুড়ে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছিলেন ৫৫ জন। অথচ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। মাসিক গড় হিসাবেও এ ধরনের অপরাধের হার গত বছরের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ২৪ আগস্ট পালিত হচ্ছে ইয়াসমিন হত্যা দিবস, যা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবেও পরিচিত। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিন পুলিশ সদস্যদের দ্বারা গণধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ওই হত্যার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে দিনাজপুরে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। পরবর্তীতে সেই আন্দোলন দেশব্যাপী নারী অধিকার ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।

ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের পর ৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বন্ধ হয়নি। বরং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬৯টি ছিল একক ধর্ষণ এবং ১৮০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের পর হত্যার ২০২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার একটি বড় অংশেই শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১০ জন নারী ও ২১ জন শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার এ চিত্র মানবাধিকারকর্মী ও নারী অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সম্প্রতি মাদারীপুরের শিবচরে ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ফারুক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তিনি ধর্ষণের পর ওই নারীকে হত্যা করে মরদেহ ঝোপের পাশে ফেলে রাখার কথা জানান। একই ঘটনায় নারীর এক বছর বয়সী শিশুপুত্রকে আড়িয়াল খাঁ নদীতে ফেলে হত্যার কথাও তিনি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করা, ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়া অথবা পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে। তবে এর পেছনে সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার এবং অপরাধীদের বিচার না হওয়ার সংস্কৃতিকেও তারা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এ ধরনের নৃশংস ঘটনা সমাজের মানুষের মধ্যেও গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করে। তার মতে, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার এবং অপরাধের যথাযথ বিচার না হওয়া ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

চলতি বছরের মার্চে মিরপুরে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এর আগে গত বছর মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে তার বোনের শ্বশুর ধর্ষণ ও হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। দুটি ঘটনাই নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’-এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

তিনি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

জিনাত আরা হকের মতে, সঠিকভাবে আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা না গেলে আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা কমে যায়।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ধর্ষণবিরোধী আইন যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। পুলিশ থেকে শুরু করে চিকিৎসক পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা না পেলে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

তিনি আরও বলেন, নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট। বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও সবসময় এই সামাজিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থাকেন না। তার মতে, নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষক সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে ভুক্তভোগীর তুলনায় বেশি ক্ষমতাবান হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম ধর্ষণের পর হত্যা বন্ধে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তা গ্রহণ, সময়মতো মেডিক্যাল পরীক্ষা, ডিএনএসহ অন্যান্য ফরেনসিক আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিশু ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সহায়ক ও বয়সোপযোগী জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ এবং মামলার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। শিশুদের বয়সোপযোগীভাবে নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোথাও যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সামাজিক বা পারিবারিক সম্মানের অজুহাতে তা গোপন না করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ, সচেতনতা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া না গেলে ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD