বাজারের এই অস্থিরতাকে কেবল বৈশ্বিক মন্দা, টাকার অবমূল্যায়ন কিংবা আমদানি খরচের ওপর চাপিয়ে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, সংকট মূলত অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার গলদে। দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে মধ্যস্বত্বভোগী ও অদৃশ্য সিন্ডিকেটের যে শক্তিশালী জাল বিস্তৃত, তা ভাঙতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে আসতে আসতেই পণ্যের দাম যে অযৌক্তিক হারে লাফিয়ে বাড়ে, তার পেছনে রয়েছে পরিবহন চাঁদাবাজি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অবৈধ মজুতদারি এবং তথাকথিত কর্পোরেট মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে বাজারে যে তদারকি অভিযান চালানো হয়, তার চরিত্র অনেকটা লোকদেখানো। খুচরা পর্যায়ের ছোট ছোট দোকানিকে জরিমানা করে সাময়িক খবর তৈরি হলেও পাইকারি মোকাম এবং বড় বড় সিন্ডিকেটের রাঘববোয়ালরা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা কমিশন থাকা সত্ত্বেও বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ও পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই বললেই চলে।
এই চরম বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর। মাছ-মাংস সাধারণ পরিবারের পাত থেকে আগেই উধাও হয়েছে; এখন ডিম ও ডালের মতো সস্তা প্রোটিনের জোগান দেওয়াও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা কাটছাঁট করছে, যার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যের ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল আশ্বাস বা কাগুজে পদক্ষেপে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে দৃশ্যমান ও কঠোর নীতিগত হস্তক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, উৎপাদনস্থল থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্বচ্ছ ও মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাইকারি মোকাম এবং কোল্ড স্টোরেজগুলোতে নজরদারি বাড়িয়ে কৃত্রিম মজুত ভেঙে দিতে হবে। তৃতীয়ত, টিসিবি ও খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সহায়তা পায়। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমা ফিরিয়ে আনতে হলে বাজার কারসাজিকারীদের রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করার কোনো বিকল্প নেই।