আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি নতুন পাঠ্যবই মুদ্রণের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কাজের গতিতে স্পষ্ট ফারাক দেখা গেছে। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর কাজে লক্ষণীয় অগ্রগতি হলেও মাধ্যমিক স্তরে প্রক্রিয়াটি বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহ এবং কয়েকটি শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করার প্রক্রিয়া এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় বছরের প্রথম দিনেই সব শিক্ষার্থীর হাতে শতভাগ বই তুলে দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বইয়ের মুদ্রণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। কাটিং, বাঁধাই এবং প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) সম্পন্ন করে ইতোমধ্যে ৭৪ শতাংশ বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরে প্রথম ধাপের দরপত্রের আওতাভুক্ত বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপা সম্পন্ন হয়েছে এবং আনুষঙ্গিক তদারকি শেষে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি নবম-দশম শ্রেণিতে; এ স্তরে বই সরবরাহের অগ্রগতি এখনো মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য প্রস্তাবিত চারটি নতুন বইয়ের মুদ্রণ কার্যাদেশ এখনো ঝুলে রয়েছে। আগামী রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) বৈঠকে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এগুলোর কার্যাদেশ প্রদান করা হতে পারে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এর আওতায় প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৩১ কোটি বই তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের বিশেষ পাঠ্যপুস্তকও। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিকে রয়েছে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার কপি। কাজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের জানান, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই মাঠপর্যায়ে প্রেরণ করা। কিছু মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সামান্য বিলম্ব হলেও জানুয়ারির নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের শুরুতে শতভাগ বই সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও নির্ধারিত সময়ে বিতরণ শেষ করা যায়নি; চলতি শিক্ষাবর্ষের সব বই সরবরাহ সম্পন্ন করতে ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ পর্যন্ত লেগেছিল, আর তার আগের বছর সময় লেগেছিল প্রায় তিন মাস। এর পাশাপাশি নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যক্রমে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনবৃত্তান্ত, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নতুন যুক্ত হতে যাওয়া চার বইয়ের মধ্যে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’। অন্যদিকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি যুক্ত করার পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষণা-সংক্রান্ত বর্ণনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে; যার ফলে আওয়ামী লীগ আমল, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের সময়ে স্বাধীনতার বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রতিফলিত হচ্ছে।
সূত্র: এনসিটিবি