বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন পরিস্থিতির মূল্যায়নে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট’ (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এর তালিকায় বিশ্বের ১৪৩টি দেশ ও স্বতন্ত্র বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১২৩তম। এ বছর সামগ্রিক অগ্রগতিতে ইতিবাচক ধারা বজায় রেখে বিশ্বে ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উন্নতির গতিতে শীর্ষস্থানে রয়েছে দেশটি। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশটির স্কোর বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশ নিচে অবস্থান করছে এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনুন্নত অনেক দেশের তুলনায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
ডব্লিউজেপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের সূচকে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর শূন্য দশমিক ৩৯, যেখানে আন্তর্জাতিক গড় শূন্য দশমিক ৫৫। সূচকে যথারীতি নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে ইউরোপের দেশগুলো; তালিকার শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ। আঞ্চলিক তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে নেপাল; এর পরেই রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের নিচে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অবস্থান করছে। এমনকি আফ্রিকার ঘানা (৬২তম), কেনিয়া (১০০তম), লাইবেরিয়া (১০৩তম), সিয়েরা লিওন (১১০তম), নাইজেরিয়া (১২০তম) এবং জিম্বাবুয়ের (১২২তম) মতো দেশগুলোর চেয়েও সূচকে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
মূলত আটটি মৌলিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে আইনের শাসন পরিমাপ করেছে ডব্লিউজেপি। এগুলো হলো—সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা। মূল্যায়িত আটটি খাতের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও বাকি পাঁচটি খাতেই অবস্থানের অবনতি হয়েছে। সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের কার্যকর প্রয়োগে কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার চিত্র। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মানবাধিকার রক্ষার মূল্যায়নভিত্তিক এই মানদণ্ডে শূন্য দশমিক ৩১ স্কোর পেয়ে ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যা দেশের জন্য সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে দেওয়ানি বিচার নিশ্চিতেও চরম দুর্বলতা দেখা গেছে; শূন্য দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩২তম। বিপরীতে, তুলনামূলক ইতিবাচক ফলাফল এসেছে ‘মুক্ত সরকার’ মানদণ্ডে, যেখানে শূন্য দশমিক ৪২ স্কোর পেয়ে বাংলাদেশ ১২৮তম অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এবং বিধি-বিধান প্রয়োগে শূন্য দশমিক ৫৬ স্কোর পেয়ে দেশ দুটিতেই ১১৪তম স্থান অধিকার করেছে। ফৌজদারি বিচার এবং ঘুষ-অনিয়ম মাপার ‘দুর্নীতির অনুপস্থিতি’ ক্যাটাগরিতে শূন্য দশমিক ৩৪ স্কোর নিয়ে ১১৯তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে আইনি জবাবদিহিতা পরিমাপক ‘সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা’ মানদণ্ডে শূন্য দশমিক ৩৮ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ৯৪তম স্থানে। সার্বিকভাবে সূচকে অবস্থান কিছুটা এগোলেও মৌলিক অধিকার ও নাগরিক বিচার প্রাপ্তির মতো পাঁচটি স্তম্ভে অবনতি দেশের আইনি ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হিসেবে স্পষ্ট হয়েছে।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি)