শিরোনাম :
নবারুণ অরুণ প্রভায় জাপানে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব: শামা ওবায়েদ বিহারের সিওয়ানে বাজি তৈরির কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ: দুই শিশুসহ নিহত বেড়ে ৫ ফিলিপাইনে প্রশিক্ষণের সময় মাঝআকাশে দুই সামরিক বিমানের সংঘর্ষ, ৪ পাইলট নিহত বিশ্ব শান্তিরক্ষা ও সমন্বিত অগ্রযাত্রায় চীনের ‘নতুন দীর্ঘ মার্চ’ বিশ্বমঞ্চে ইতিবাচক চালিকাশক্তি চীন-কেনিয়া দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বে নতুন গতি: সিএমজির বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্পিকার সম্পাদকীয় : লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার: সাধারণের দীর্ঘশ্বাস ও কাঠামোগত ব্যর্থতা দিল্লি পুলিশের শান্তি মুচলেকায় সই করতে অস্বীকৃতি আইসা সভানেত্রী নেহা বোরার পাঁচ বছরে পেনশন ব্যয় দ্বিগুণের শঙ্কা: চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থার সুপারিশ বেতন কমিশনের বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকির সতর্কতায় টানা ৩ দিন বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

কলারোয়ায় ৪শ’ বছরের পুরাকীর্তির মঠ-মন্দিরটি সংরক্ষণ দাবি

জার্মানবাংলা২৪ রিপোর্ট :
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৮

মোস্তাক আহমেদ, কলারোয়া প্রতিনিধি: প্রকৃতির সঙ্গে পুরাকীর্তির ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা যাদের আকর্ষণ করে তা দেখতে হলে আসতে হবে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী জনপদ সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নে।

মধ্যযুগীয় নানা পুরাকীর্তির নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গোটা সোনাবাড়িয়া জুড়ে। এমনই এক পুরাকীর্তির নাম মঠবাড়ি মন্দির। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। তবে বর্তমানে মঠবাড়ি মন্দির এলাকাটি প্রত্নতত্ব বিভাগের আওতায় নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

সরজমিন ঘুরে জানা যায়, কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৯.৬ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাবাড়িয়া গ্রামে এই প্রত্নতত্ত্ব টির অবস্হান। যা প্রায় পৌনে ৪শ’ বছরের পুরানো ৬০ ফুট উঁচু টেরাকোটা ফলক খচিত পিরামিড আকৃতির এই মঠ-মন্দির প্রাচীন স্হাপত্যের অপরূপ নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

তবে জরাজীর্ণ ও ভগ্নপ্রায় এই ঐতিহাসিক মঠ-মন্দিরটি দ্রত সংরক্ষণ না করায় ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া চুরি হয়ে গেছে মঠ-মন্দিরের পাশে অবস্হিত বিশাল কষ্টি পাথরের শিবমূর্তিটি। অথচ এক সময় মঠ-মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনায় এলাকাজুড়ে মুখোরিত থাকতো।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক মো: মোশারফ হোসেনের লেখা ‘প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রতিবেদন বৃহত্তর খুলনা’ বইয়ের ৯৪ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় কলামে উল্লেখ করা হয়েছে, এই মন্দির ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) নির্মাণ করেছিলেন। যেটি সতীশ চন্দ্র মিত্রের বইয়েও লেখা রয়েছে।

এই পুরাকীর্তির সবচেয়ে বড়-এর ত্রিতলবিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির। যেটি ‘শ্যামসুন্দর মন্দির’ নামে পরিচিত। এর সঙ্গে লাগোয়া রয়েছে দুর্গামন্দির ও শিবমন্দির। এই মন্দিরের দক্ষিণে একটি অসম বাহুবিশিষ্ট চৌকো দিঘি আছে। শ্যামসুন্দর মঠের নিচের তলা ১০.৮২ মি./৩৫ফু.-৬ ই. বর্গাকার ভিত পরিকল্পনায় নির্মিত। মঠের দ্বিতলের মাপ ১০ মি./৩২ফুট.-১০ইি . এছাড়া ৯.৯৮ মি./৩২ ফু.-৯ ই. এবং ত্রিতল ৭.৪৬মি./২৪ ফু.-৬ ই. ও ৭.১৬ মি./২৩ ফু.-৬ ই.। ফলে মন্দিরটি একটি পিরামিড আকৃতি ধারণ করেছে। দক্ষিণ মুখি এই মন্দিরের নিচের তলার ভিতরের অংশে চারটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগের চারপাশে রয়েছে ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ৬.১৪ মি./২০ ফু.-২ ই.পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এবং ১.৩২ মি./৪ ফু.-৫ ই. চওড়া একটি মন্ডপ। তৃতীয় ভাগের পশ্চিম পাশের কোঠা এবং মাঝের কোঠাটির উত্তরে একটি করে প্রকোষ্ঠ রয়েছে। কিন্ত পূর্বাংশের কোঠাটির পিছনে রয়েছে একটি অলিন্দ, যেখানে দ্বিতল ভবনে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে।

ধারণা করা যায়, পূর্ব ও পশ্চিম কোঠা দুটিতে সংরক্ষিত মূর্তির উদ্দেশ্যে মন্দিরটি নিবেদিত ছিল। দ্বিতলে রয়েছে একটি দক্ষিণমুখি কোঠা। এর পরিমাপ ২.২৮ মি./৭ফু.-৬ ই. ও ১.৯৮মি./৬ ফু,-৬ ই.। ত্রিতল ভবনটি তুলনামূলক ছোট। এর দক্ষিণ দিকের মধ্যের খিলানটির ওপর একটি পোড়ামাটির ফলক রয়েছে।

মোশারফ হোসেনের ওই জরিপ বইয়ে আরো বলা হয়েছে, শ্যামসুন্দর মঠের নিচে রয়েছে ৪৫.৭ সেমি./১ ফু.-৬ ই. উঁচু নিরেট ম । এর প্রত্যেক তলার ছাদপ্রান্ত ধনুকের মত বাঁকা, কোণগুলো কৌণিক। এগুলোর ছাদের ওপর ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে ঊর্ধমুখি গম্বুজ রয়েছে। আর মাঝখানে তুলনামূলক বড় একটি রত্ন রয়েছে। তাই এটি ‘নবরত্ন স্মৃতি মন্দির’ নামে পরিচিত। নবরত্ন বা শ্যামসুন্দর মঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আরও একটি দক্ষিণ মুখি মন্দির আছে। যেটি ‘দুর্গা মন্দির’ নামে পরিচিত। শ্যামসুন্দর মন্দিরের গা ঘেঁষে পূর্বমুখি মন্দিরটিতে ৯১.৪৩ সেমি./৩ ফুট উঁচু একটি কালো কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ ছিলো। কয়েক কোটি টাকা দামের এই কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গটি চোরাকারবারীরা চুরি করে নিয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে সিমেন্ট দিয়ে নতুন একটি শিবলিঙ্গ ভক্তদের জন্য বানানো হয়েছে। এর ওপর একটি ভাষ্য ফলক পাঠোদ্ধার অনুপযোগী অবস্হায় আছে এর ছাদ চৌচালা, কার্ণিশ ধনুকাকারে বাঁকা এবং কোণগুলো কৌণিক। এটি ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ নামে পরিচিত। মন্দিরে সব ক’টি ইমারতে ২২.৮৫ সেমি. ২০.৩১ সেমি. ২.৫৩ সেমি.(৯ই. ৮ই. ও ১ই.) পরিমাপের ইট ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো গাঁথা হয়েছে চুন ও সুরকি মিশ্রিত মসলা দিয়ে। বর্তমানে এ মন্দির টি পরিত্যক্ত অবস্হায় রয়েছে। এই মঠের পাশে আর ও ৮ টি (মতান্তরে ১০টি) মন্দির ছিল।
এলাকাবাসীর মতে, রামহংস পরমানন্দ এক সময় মন্দিরগুলো পরিদর্শনে এসেছিলেন। মঠ মন্দির গুচ্ছের অল্প দক্ষিণে ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে যে জলাশয়টি আছে তার পাকাঘাটে ব্যবহৃত ইটের সাথে ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ এর ইটের মিল পাওয়া যায়। তাতে ধারণা করা হয় পুকুরটি একই সময়কালের নিদর্শন। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক পুকুরটি বিষমবাহুর আকার ধারণ করেছে।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে এই শ্যামসুন্দর মঠ দেখতে সোনাবাড়িয়া এসেছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক উপ-পরিচালক ও পুরাতত্ত্ব বিষয়ক লেখক মো: মোশারফ হোসেন তার সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক জ্যোতির্ময় মল্লিক এবং খুলনা জাদুঘরের একটি টিম। পরিদর্শনকালে তারা সংশিষ্ট এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় এলাকাবাসী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দির টি সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তুু পরিতাপের বিষয় হলো খুলনা জাদুঘরের টিম পরিদর্শনের ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এ মঠ-মন্দিরটি আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। তবে গত দুই মাস আগে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী এসে মন্দিরের পাশে ছোট একটি সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। যাতে লেখা আছে এই মন্দিরের কোন সম্মতি বিনষ্ট না করার জন্য।

এলাকাবাসীর মতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে মঠটি সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারতো সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সকল মানুষের কাছে দর্শনীয়স্হান ও দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

সোনাবাড়ীয়া এলাকার কলারোয়া সরকারি কলেজের প্রভাষক (অবসপ্রাপ্ত) বাবু সুপ্রশাদ বলেন, ঐতিহাসিক এ প্রত্নতত্ত্বটি সংস্কার ও দেখার কোন মানুষ না থাকায় ২৫/২৬ বছর আগে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের শিবলিঙ্গটি চুরি হয়। সে সময় এ ঘটনায় কলারোয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছিলো। তবে সেটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলীদের পূজা করার জন্য সিমেন্ট দিয়ে একটি শিবলিঙ্গ তৈরী করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এই মন্দির গুচ্ছো দেখার জন্য স্হানীয় পর্যায়ে কয়েকটি গ্রামের মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি তার ছোট ভাই দেব প্রসাদ। তিনি বলেন, তিনি নিজে কয়েকবার খুলনা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অফিসে যোগাযোগ করেছেন তাবে কর্মকর্তারা এই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সংরক্ষন করা হবে বলে জানিয়েছে। তিনি কর্মকর্তাটির নাম বলতে পারেনি। তিনি মঠবাড়ি মন্দিরটি ধংশ হওয়ার আগে এটি সংরক্ষন করার জোর দাবি জানান।

কলারোয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মারুফ আহম্মেদ জানান, কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ চুরির ঘটনাটি অনেক বছর আগের ঘটনা হওয়ায় এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান।

কলারোয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন বলেন, প্রায় ৪’শ বছরের পুরানো এই পূরাকীর্তিটি কলারোয়া উপজেলার ইতিহাস, সংস্কৃতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, জরাজীর্ণ অবস্হায় পড়ে থাকা এই মঠ-মন্দিরটি সংস্কার ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরীর জন্য একাধিক বার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফপ্তরে জানিয়েছেন। কিন্ত আজ পর্যন্ত কোন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কলারোয়া উপজেলার ঐতিহ্য শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দিরটি রক্ষা করে পুরানো এই প্রত্নতত্বকে সংস্কার ও কলারোয়া উপজেলাকে পর্যটন এলাকা ঘোষণার করার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আর.এম সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, কলারোয়ার এই শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দিরটি বর্তমানে প্রত্নতত্ব বিভাগ দায়ীত্ব নিয়েছে। আমরা স্হানীয় প্রশাসন এটি সংরক্ষণের জন্য কাজ করতে পারছি না।

তিনি বলেন, কলারোয়ার এই মঠ-মন্দিরটি সংস্কার ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরীর জন্য সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD