সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো পুরোদমে কার্যকর হলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারের পেনশন খাতের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকায়। এতে জাতীয় বাজেটের ওপর চরম ও অসহনীয় আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনার জোরালো সুপারিশ করেছে কমিশন।
কমিশনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪.৫ শতাংশ হারে পেনশনভোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় পেনশন প্রদানের সময়কালও উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বর্তমানে বহু অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ২০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে নিয়মিত এ সুবিধা ভোগ করছেন। ২০১৫ সালের বেতন স্কেলের অধীনে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পেনশন বাবদ রাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা পূর্ণ অর্থবছরে দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। তবে নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ লাখ ১৬ হাজার পেনশনভোগীর জন্য সরকারকে গুনতে হবে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। আর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এই সংখ্যা ১০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছালে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায়।
কমিশন পর্যবেক্ষণ করেছে, রাজস্ব আয়ের ওপর এমন ক্রমবর্ধমান চাপ দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বর্তমানে কর্মচারীদের কোনো অর্থ জমা দিতে হয় না; অবসরের পর শেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশ মাসিক পেনশন এবং অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) সুবিধা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হয়। একই সুবিধা ভোগ করছে ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ৯০টি স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, যার সিংহভাগ ব্যয় বহন করে সরকার। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো নির্ধারিত ‘চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা’ চালুর প্রস্তাব করেছে কমিশন। শ্রীলঙ্কায় কর্মচারী ৮% ও সরকার ১২%, পাকিস্তানে কর্মচারী ১০% ও সরকার ১২%, ভারতে কর্মচারী ১০% ও সরকার ১২-১৪% এবং অস্ট্রেলিয়ায় ন্যূনতম ১২% হারে তহবিলে জমা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত ৩০ বছর বা তদূর্ধ্ব সময় চাকরি করায় কর্মচারীদের নিয়মিত চাঁদায় একটি বিশাল তহবিল গড়ে উঠবে, যা পুঁজিবাজার ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে সর্বজনীন ধাঁচের চাঁদাভিত্তিক কাঠামো সামাজিক সুরক্ষাকেও সংহত করবে। ২০২৩ সালে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের উদ্যোগ পর্যাপ্ত আলোচনা ও সরকারি কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত না করায় বাধার মুখে পড়েছিল। তাই এবার সব পক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু এবং কর্মকর্তা ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে গঠিত তহবিল নিরাপদ সিকিউরিটিজ ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার