বাঙালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। জামায়াতে ইসলামীসহ মৌলবাদীরা অপরাজনীতিরা চাইছেন উদযাপন বন্ধ করে দিতে। মানুষের ধর্মাচারণের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের কোনও সম্পর্ক নেই। তবু পাকিস্তানপন্থীরা বর্ষবরণের বিরোধী। গতবার বাংলা নববর্ষে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছিলেন,‘জাতির আত্মপরিচয়ে পহেলা বৈশাখ এক উজ্জ্বল উপাদান’। সেই গৌরবকেই স্বাধীনতার আগে থেকে জামায়াত লুন্ঠন করতে চায়। কারণ তারা বাঙালী জাতিসত্বাতেই বিশ্বাস করে না। ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ জামায়াত বা মৌলবাদীদের কাছে মূল্যহীন। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পহেলা বৈশাখ হচ্ছে প্রাণের উৎসব।
অনেকেই মনে করেন পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার মুসলিম মাহিফরাস সম্প্রদায়ের হাত ধরে। অনেকে আবার শশাঙ্কের শাসনামলে বঙ্গাব্দের সূচনা বলে মনে করেন। তবে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদেরই দাবি, ঋতুনির্ভর কৃষিকাজের কারণেই খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের বাংলা সন প্রবর্তন করেন। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করেই বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ বা ‘তারিখ-এ-এলাহী’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ হয়। লোক সংস্কৃতি ও পল্লীসাহিত্য গবেষক তথা বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের লেখায় পাওয়া যায়, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ সিরাজিকে দিয়ে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন আকবর। তিনিই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমির তরফ থেকে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্কে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বঙ্গাব্দ নিয়ে গবেষণার ভার দেয়। ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে সেই ক্যালেন্ডারই চালু হয়। ১৪ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে তাই বাংলাদেশে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। ভারতের বাঙালিরা অবশ্য কখনও ১৪ এপ্রিল, কখনও ১৫ এপ্রিল দিনটি পালন করে।
নববর্ষ আসলেই বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। মানুষের কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো দিনটি। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যাপিত হয় দিনটি। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তাদের মতে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা হল জনসাধারণের একটি উৎসব যা ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে (নববর্ষের দিনে) উদযাপন করা হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দ্বারা আয়োজন করা হয়। ঐতিহ্যটি ১৯৮৯ সালে শুরু হয়, যখন সামরিক শাসনের অধীনে বসবাসরত হতাশ শিক্ষার্থীরা সম্প্রদায়কে একটি উন্নত ভবিষ্যতের আশা দিতে চেয়েছিল। এটির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে মুখোশ ও ভাসমান প্রতিকৃতি যা শক্তি, শান্তি এবং অগ্রগতির জন্য অশুভকে দূরে সরানোর প্রতীক। বিদ্যালয়ের দ্বারা ভাগভাগি করা জ্ঞানের উপাদানসহ, এটি জনসংহতি এবং গণতন্ত্রকে প্রচার করে’।
পহেলা বৈশাখ বাঙালীর আবেগের অপর নাম। জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের কবিতাতেও উঠে এসেছে বাংলা নববর্ষের আহ্বান। তিনি লেখেন,
‘এসো নববর্ষ, তোরই হাতে
লিখি আমরা মুক্তির প্রাতে—
মানবতার জয়ধ্বনি,
শান্তি, প্রেম, সমতার বাণী।’
বাঙালির হৃদয়ের কবি শামসুর রহমান পহেলা বৈশাখকে নিয়ে লিখেছেন,
‘রূপসী বাংলার আত্মভোলা কবি
রাখেন হাত এই রুগ্ন লোকটার
কাঁধের শিহরণে নববর্ষে তিনি।
প্রবোধ দেন খুব বিফল আমাকেই’।
অতীতে পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি বর্বরতার প্রতিবাদের মঞ্চও। স্বাধীন বাংলাদেশে নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে সর্বজনীন লোকজ মেলা ‘বৈশাখী মেলা’। ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে সমবেত কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ পহেলা বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫) ছায়ানট প্রথম এই উৎসব শুরু করে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব সরকারের শাসনামলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরূপই গর্জে উঠেছিল রমনার বটমূল। তাই ছায়ানটকে স্বাধীন বাংলাদেশেও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হতে হয়েছে। ২০০১ সালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ১০ জন। গতবছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রামের ডিসি হিলের বর্ষবরণ মঞ্চেও ভাঙচুর চালানো হয়। আয়োজকরা বাধ্য হন অনুষ্ঠান বাতিল করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠানও মৌলবাদীদের হুমকির মুখে পড়েছে। চারুশিল্পীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নববর্ষের আহবানকে অন্য মাত্রা যোগ করলেও এটি মৌলবাদীদের পছন্দ নয়। সব শ্রেণীর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা অংশ নিলেও জামায়াত এই শোভা যাত্রাকে মানতে নারাজ। নারায়ণগঞ্জের ভূমিপল্লী জামে মসজিদের খতিব শায়খ আহমাদুল্লাহের মতে, ‘মুসলিম ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মীয় কৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’। মৌলবাদীরা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র বিরোধিতা করতে গিয়ে ঢাকার জন্মাষ্টমীর সঙ্গে তুলনা টানতে শুরু করেছেন। অথচ, দুটি পুরো ভিন্ন কারণের শোভাযাত্রা। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে ধর্ম বা অধর্মের কোনও যোগ নেই। জামায়াত নিজেদের সুবিধার্থে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বিএনপি নেতা কাজী আলাউদ্দিন তাই ভোটের আগেই জামায়াত সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিলে পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারি হতে দেবে না। কারণ, তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে লাখ লাখ হিন্দু-মুসলিম ভারতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের উগ্রতা, হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনার কথা মনে হলে এখনও গা শিউরে ওঠে’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে চলছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। আগে এর নাম ছিল নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। জামায়াতের চাপে অন্তর্বর্তী সরকার নাম রাখে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। এবার বিএনপি সরকার সেই শোভাযাত্রারই নাম রেখেছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। নাম যাইহোক পহেলা বৈশাখে চারুকলা অনুষদের শোভাযাত্রা দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু মানতে নারাজ জামায়াত। তাদের মতে,
‘শোভাযাত্রা কোনো কালেই বাংলাদেশের বা বাঙালির ঐতিহ্য ছিল না। বরং এটা ছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ মাত্র। যাকে সংস্কৃতির লেবাস পরিয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ঢাকায় প্রথম চালু করা হয়।চারুকলা অনুষদের কাঁধে ভর করে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের উপর এটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।’
আসলে বাঙালীর মেধার বিকাশ চায় না জামায়াত। রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতোই নজরুলগীতিরও তারা বিরোধী। বাউলদের ওপরও হামলার খবর পাওয়া যায়। বাঙালীর সংস্কৃতিকেই মৌলবাদীরা হত্যা করতে চাইছে। তবে বর্তমান সরকার তাদের সেই অপচেষ্টাকে রুখে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আগলে ধরে বাঙালীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অবিচল। এবার তাই পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যাবস্থা।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথা দিয়েই শেষ করা যাক এই আলোচনা। তিনি বলেছিলেন, ‘আবহমানকাল ধরে নানা রূপ ও বৈচিত্র্য নিয়ে জাতির জীবনে বার বার ঘুরে আসে পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের উৎসবের সাথে যেন ভরে ওঠা প্রকৃতি ও প্রাণের যোগ আবহমানকাল ধরে বিদ্যমান। আমাদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় স্বজাতির অতীত গৌরব ও ঐশ্বর্য। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সুদূর অতীতকাল ধরে নির্মীয়মাণ বিশালত্ব এক শক্ত ভিত্তি লাভ করে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বের বাণী একত্রিত হয়ে গঠন করে এক সুগ্রন্থিত জাতি।’