বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪০ বিলিয়ন (৪ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বিদেশি জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে টোল পরিশোধ করতে হবে—এমন একটি কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে তেহরান। এ বিষয়ে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করেছে ইরান। টোল থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ এসব উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে তেহরান। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়।
অবরোধ ঘোষণার সময় ইরান জানায়, হরমুজ প্রণালির একটি অংশ তাদের ভৌগোলিক সীমানার আওতায় পড়ায় এই পথ ব্যবহারকারী বিদেশি জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের অধিকার তাদের রয়েছে। পরে গত মার্চে এ-সংক্রান্ত একটি আইনও ইরানের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়।
তবে ইরানের এই অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ওয়াশিংটন ইরানের কয়েকটি বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপ করে।
সম্প্রতি ওমান সফরে গিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, “হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।” তার এই মন্তব্যকে ইরানের নতুন সামুদ্রিক নীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে বর্তমানে বাহরাইন সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের জন্য কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে টোল আরোপ করতে পারে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তিতেই হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ের শর্ত মেনে নেবে না।
রুবিওর ভাষায়, “আন্তর্জাতিক জলপথ কোনো একক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়। যদি এ ধরনের নজির প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও আন্তর্জাতিক নৌপথে একই ধরনের টোল আরোপ করতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৭০টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও এনডিটিভি।