প্রবীণ মানে জীবনের অবসান নয়; বরং অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও মূল্যবোধের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। একটি পরিবারের ইতিহাস যেমন প্রবীণদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, তেমনি একটি সমাজের সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাও তাঁদের হাত ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়। অথচ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণই ক্রমে একাকিত্ব, অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন।
একসময় বাংলাদেশের যৌথ পরিবারব্যবস্থায় প্রবীণরা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের পরামর্শ ছিল সিদ্ধান্তের ভিত্তি, তাঁদের উপস্থিতি ছিল পরিবারের নিরাপত্তা ও আবেগের আশ্রয়। সময় বদলেছে। ছোট পরিবার, কর্মব্যস্ততা এবং সন্তানদের কর্মসূত্রে দূরে বসবাসের বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ একই ঘরের মধ্যেও নিঃসঙ্গ। কারও সন্তান বিদেশে, কেউ আবার সন্তানদের ব্যস্ততার কারণে দিনের পর দিন সঙ্গহীন জীবন কাটাচ্ছেন। এই নিঃসঙ্গতা কখনো অর্থের অভাবে নয়; বরং ভালোবাসা, সময় ও মনোযোগের অভাবে আরও গভীর হয়ে ওঠে।
প্রবীণদের মর্যাদা নিশ্চিত করা তাই কেবল মানবিকতার বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বোধেরও প্রশ্ন। তাঁদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, চলাচলের উপযোগী গণপরিবহন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে তাঁদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগও তৈরি করতে হবে, যাতে পরিবর্তিত সমাজে তাঁরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে না করেন।
তবে রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বই সবচেয়ে বড়। প্রবীণ বাবা-মায়ের জন্য দামি উপহার হয়তো প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তাঁদের সঙ্গে কিছু সময় কাটানো, কথা শোনা, সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন কমে যায়—এই ধারণা বদলাতে হবে। বরং জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে একজন মানুষের প্রয়োজন হয় আরও বেশি সম্মান, নিরাপত্তা ও আপনজনের সান্নিধ্য।
আজকের তরুণ প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে—আজ যাঁদের আমরা প্রবীণ বলছি, তাঁরাই একদিন আমাদের জন্য পথ তৈরি করেছেন। আর আগামী দিনের প্রবীণ হব আমরাই। তাই প্রবীণদের প্রতি আমাদের আচরণ আসলে ভবিষ্যৎ সমাজের প্রতিচ্ছবি।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রবীণদের জন্য শুধু ভাতা নয়, মর্যাদা; শুধু চিকিৎসা নয়, সুস্থ জীবন; শুধু নিরাপত্তা নয়, ভালোবাসা নিশ্চিত করা। কারণ প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, তাঁরা আমাদের অতীতের সাক্ষী, বর্তমানের অভিভাবক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন্ত শিক্ষাগ্রন্থ। তাঁদের সম্মান করা মানে নিজেদের শিকড়কে সম্মান করা।