সন্তানের মা হওয়ার পরও যেন নারী ক্রিকেটারদের বাইশ গজের আঙিনায় ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য পূর্ণ বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির নীতিমালা প্রণয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নতুন এই সিদ্ধান্তের আওতায় বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তির অধীনে থাকা জাতীয় পর্যায়ের নারী ক্রিকেটাররা মাতৃত্বকালীন ছুটির পুরো সময় নিয়মিত পারিশ্রমিক ও আনুষঙ্গিক সব ভাতা ভোগ করবেন।
বৃহস্পতিবার (৪ নভেম্বর) বিসিবির অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে ছুটির সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার রূপরেখা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিসিবির পরিচালক ও নারী ক্রিকেট বিভাগের প্রধান রফিকুল ইসলাম বাবু বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটির একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্রেমওয়ার্ক দ্রুতই চূড়ান্ত রূপ পাবে। বোর্ড সভায় এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলেও ছুটির মেয়াদ চার মাস নাকি ছয় মাস রাখা হবে, তা নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী সাধারণ বোর্ড সভায় নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে মাতৃত্বের বিরতি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরে আসার দৃষ্টান্ত প্রায় বিরল। অথচ বিশ্বমঞ্চে ২০২২ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানি অধিনায়ক বিসমাহ মারুফের ফিরে আসার গল্পটি ক্রিকেটবিশ্বে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল; যেখানে তিনি মাত্র ছয় মাসের কন্যা ফাতেমাকে কোলে নিয়ে টুর্নামেন্টে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে এতদিন সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার অনুপস্থিতির কারণে আর্থিক অনিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় নারী ক্রিকেটারের মাঠের ক্যারিয়ার অকালে থমকে গেছে।
সম্প্রতি জাতীয় নারী দলের পেসার সুরাইয়া আজমিন মাতৃত্বকালীন সময়ে বোর্ডের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। গত মে মাসে ছুটির আবেদন জমা দিয়েও দীর্ঘদিন কোনো সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সাবেক তারকা ব্যাটার সানজিদা ইসলামকেও; প্রথম সন্তান জন্মের পর ক্রিকেটে সাময়িক বিরতি নিলেও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে তিনি আর খেলায় ফিরতে পারেননি। এছাড়া সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান আন্তর্জাতিক আম্পায়ার সাথিরা জাকির জেসিও মাতৃত্বকালীন সময়ে মাঠের বাইরে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
অতীতের এসব সংকট ও হতাশার অবসান ঘটাতেই নড়েচড়ে বসেছে ক্রিকেট বোর্ড। ইতোমধ্যে পেসার সুরাইয়া আজমিনের আবেদন মঞ্জুর করে তাঁকে চার মাসের পারিশ্রমিক বাবদ সমুদয় অর্থ পরিশোধ করেছে বিসিবি।
রফিকুল ইসলাম বাবু উল্লেখ করেন, এই নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য হলো চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের মনে এই আস্থা তৈরি করা যে মাতৃত্ব কখনোই ক্রিকেট জীবনের সমাপ্তি হতে পারে না। ছুটি চলাকালীন নিয়মিত বেতন-ভাতা চালু থাকলে সন্তান প্রসব ও প্রাথমিক পরিচর্যার সময়ে তাঁদের ওপর কোনো আর্থিক চাপ থাকবে না। মাতৃত্বকে প্রতিটি নারীর জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয় আখ্যা দিয়ে তিনি আরও জানান, ছুটি শেষে মাঠে ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরিসহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বিদ্যমান নির্দেশিকা মেনে নারী ক্রিকেটারদের অন্যান্য সার্বিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ও বোর্ডের পরিকল্পনায় রয়েছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ভার্চুয়াল সভার সিদ্ধান্ত ও বিসিবি নারী ক্রিকেট বিভাগের পরিচালকের বক্তব্য।