প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক টোকিও সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ) এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে গৃহীত যৌথ ঘোষণায় একে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপ্যারিটি’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, এর আওতায় আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্তর্ভুক্তি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সমুদ্রতীরবর্তী মাতারবাড়ীতে ২০১৪ সালে মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পরিবহনের জন্য ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৫০ মিটার প্রশস্ত একটি নৌ-চ্যানেল খননের মাধ্যমে এ কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে জাইকার প্রাক-সমীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী সেই চ্যানেল সম্প্রসারণ করে বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দরের রূপরেখা গৃহীত হয়। বর্তমান পরিকল্পনায় গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ, এলএনজি টার্মিনাল, সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক রফতানি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নগর ও বৈশ্বিক রফতানি হাব গড়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে, যাতে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আফ্রিকায় পণ্য রফতানির সংযোগ তৈরি করা যায়।
টোকিও যৌথ ঘোষণায় বিগ-বি উদ্যোগের প্রধান চারটি স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে: আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি স্থাপন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি; পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি জাপানি বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ; এবং শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে জাপানি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির জোগান দেওয়া।
তবে মাতারবাড়ীর বিপুল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে পর্যালোচনা চলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, মাতারবাড়ীকে ঘিরে সামগ্রিকভাবে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারই আসবে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে। এর ফলে আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর, যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ও সাপ্লাই চেইন গড়ে ওঠার মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে যৌথ ঘোষণায় সরাসরি নাম উল্লেখ না থাকলেও কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ভারতকে বিশেষ সুবিধা বা ট্রানজিট-করিডোর দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দেশের রাজনীতিতে সন্দেহ দানা বাঁধছে। গত ৩১ অক্টোবর ঢাকায় এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান কোনো রাখঢাক না রেখে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, মাতারবাড়ী নিয়ে কোনো লুকোচুরি জাতি বরদাশত করবে না এবং কানেক্টিভিটির নামে দেশকে কারো কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো পর্যালোচনার পর তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলীর মতে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাজার একীভূত করার অর্থনৈতিক ধারণা চমৎকার হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এ জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা ঝুঁকিপূর্ণ। একই সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে জাপানের সম্পৃক্ততার প্রেক্ষিতে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া এবং ভারতের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্পষ্ট করেন, মাতারবাড়ী সবার জন্য উন্মুক্ত। চীন যেমন চট্টগ্রাম ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করছে, তেমনি মাতারবাড়ীতেও দেশের সার্বভৌম স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সকল দেশের যৌক্তিক প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ-জাপান যৌথ ঘোষণা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর পরবর্তী পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষক মতামত।