পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আজাদ কাশ্মীর পুনর্দখলের পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড—চট্টগ্রাম বন্দর, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চল ভারতের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়ার বিতর্কিত ও উসকানিমূলক দাবি তুলেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আমলে এ অঞ্চলগুলো ‘জোরপূর্বক হস্তান্তর’ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই-কে (ANI) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিজেপি দলীয় এই লোকসভা সদস্য এ দাবি উত্থাপন করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিকৃত করে নিশিকান্ত দুবে দাবি করেন, নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দর অঞ্চল একসময় প্রাচীন ‘তিপ্রা’ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই কথিত যোগসূত্র টেনে তিনি বলেন, “পাকিস্তান থেকে আজাদ কাশ্মীর পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি নেহেরু যেসব অঞ্চল বলপূর্বক হস্তান্তর করেছিলেন, তা ফেরত নেওয়ার সময়ও সমাগত; চাই তা নোয়াখালী হোক, চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা সিলেট।”
দুবের বক্তব্য অনুসারে, অবিভক্ত ত্রিপুরার শেষ স্বাধীন রাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য তাঁর ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে জবাবদিহিতার মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, রাজা বীর বিক্রম প্রশ্ন তুলেছিলেন যে কীভাবে তাঁর রাজ্যভুক্ত নোয়াখালী পাকিস্তানকে দেওয়া হতে পারে কিংবা সিলেট ও চট্টগ্রামে গণভোট হয়। পরবর্তীতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের হস্তক্ষেপে এবং মহারানি কাঞ্চন প্রভা ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব একসেশন’-এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে যুক্ত হয়।
১৯৪৬ সালে নোয়াখালীর দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে জওহরলাল নেহেরুকে তীব্র আক্রমণ করেন এই বিজেপি সাংসদ। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নেহেরু নোয়াখালীর সহিংসতার দিকে নজর না দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লীগকে যুক্ত করার রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিলেন। দুবে বলেন, নেহেরু ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ক্ষমতা নেওয়ার পরই মুসলিম লীগ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ শুরু করে এবং ১৫ অক্টোবর নোয়াখালীতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে একদিনেই প্রায় ১০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় (নর্থ-ইস্ট) রাজ্যগুলোর অনুন্নয়নের মূল কারণ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের ভৌগোলিক অনুপস্থিতিকে দায়ী করেন দুবে। তাঁর ভাষ্যমতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খনিজ ও প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদ ব্যবহার না হওয়া, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের হাতে না থাকা। তাই উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বার্থরক্ষায় চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালী অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘ইতিহাস সংশোধনের সময় এসেছে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এছাড়া সিলেটের গণভোট ও নোয়াখালী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মুসলিম লীগের তথাকথিত ‘রেড আর্মি’ সদস্য বাহারুল ইসলাম যুক্ত ছিলেন দাবি করে দুবে অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে কংগ্রেস বাহারুল ইসলামকে রাজ্যসভার সাংসদ, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং অবসরের পরও পুনরায় সাংসদ বানিয়ে পুরস্কৃত করেছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ত্রিপুরার রাজপরিবারের প্রধান ও ‘তিপ্রা মথা’ দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেব বর্মাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেশভাগের সময় তাঁর ঠাকুরমাকে অন্ধকারে রেখে সাবেক ত্রিপুরা রাজ্যের ভূখণ্ড পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ এনেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, সমুদ্রসংযোগ থাকলে আজ ভারতকে ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে সামরিক শঙ্কায় থাকতে হতো না। অতীতে ভুলবশত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলগুলোকে পুনরেকত্রীকরণ করাই তাঁর দলের ‘গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড’ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
তথ্যসূত্র: ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই (ANI)-কে দেওয়া বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সাক্ষাৎকার (তারিখ: ৬ নভেম্বর)।