শীর্ষ পদে থাকা একাধিক নারী নেতার ধারাবাহিক পদত্যাগের ঘটনায় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নারী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া, গণতান্ত্রিক কাউন্সিল এড়িয়ে একতরফা কমিটি পুনর্গঠন এবং দলে নারী নেতৃত্বকে পদ্ধতিগতভাবে কোণঠাসা করার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের ঘোষণা দেন এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম শীর্ষ নেতা সামান্তা শারমিন। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক জোট গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে দল ছেড়েছিলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৯ মাসের মাথায় সামান্তা শারমিনের এই পদত্যাগ দলটির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও জামায়াত-জোটকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে আবারও প্রকাশ্যে নিয়ে এলো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন দল ছাড়ার নেপথ্য কারণ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে পড়ায় দলটি ক্রমশ জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামান্তা শারমিন উল্লেখ করেন, সমতার ভিত্তিতে আধুনিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও দল শেষ পর্যন্ত নারীবিরোধী রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গেই আপস করেছে। এছাড়া গত ২৩ অক্টোবর কোনো কাউন্সিল ছাড়াই বিতর্কিতভাবে শীর্ষ পদে রদবদল ঘটিয়ে তাঁকে ‘জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক’ পদ থেকে অবনমিত করে কেবল ‘যুগ্ম আহ্বায়ক’ করার প্রক্রিয়াকে তিনি চরম অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যা দেন।
দল প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় এমন প্রভাবশালী নারী নেত্রীদের বিদায়ের ঘটনা দলটির রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টিকে ‘স্বাভাবিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি’ হিসেবেই দাবি করছে।
এ বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, জামায়াতের সঙ্গে জোট ছিল সমসাময়িক কৌশলগত সিদ্ধান্ত; এতে সবার অভিন্ন মত না থাকা বা দল ত্যাগ করা রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। তিনি দাবি করেন, দলের স্থবিরতা দূর করে কার্যক্রমে গতি আনতেই আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।
এদিকে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের দাবি, জামায়াতের প্রভাবে এনসিপির নীতিগত পরিবর্তন বা ‘জামায়াতীকরণ’ ঘটার অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, সংস্কার ও আইনি জবাবদিহির দাবিতে মাঠপর্যায়ে কৌশলগত ঐক্য থাকলেও জাতীয় সংসদে নীতি ও আইন প্রণয়নে এনসিপি নিজস্ব অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, শীর্ষস্থানীয় পরিচিত কয়েকজনের প্রস্থানে দলে নারী নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়।
তথ্যসূত্র: এনসিপির পদত্যাগী নেতাদের বিবৃতি ও শীর্ষ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া।