আরিফ ঢালী, বাগেরহাট প্রতিনিধি: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা। সোমবার ষষ্ঠি পূজার মধ্যে দিয়ে শুরু হলো দূর্গোৎসব। চলবে পাঁচ দিন ধরে। শারদীয় দূর্গাপূজাকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যেন বইছে উৎসবের আমেজ।
বাগেরহাটের হাকিমপুরে শিকদার বাড়িতে দূর্গোৎসবের প্রথম দিনেই উপচেপড়া ভিড়।দেশি বিদেশী ভক্ত দর্শনার্থী দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিমার পূজামন্ডপে ভিড় করছেন। দূর্গোৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে জেলাজুড়ে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
গত আট বছর ধরে জেলা তথা দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিমার দূর্গাপূজাটি ব্যক্তি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শিকদার বাড়িতে।
বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অজ পাড়াগাঁ বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শিকদারবাড়ি। শিকদারবাড়ির এই ধরনের আয়োজনের বাগেরহাটের এই গ্রামটি এখন সবার কাছে সুপরিচিত। দূর্গাপূজা আসলে এই গ্রামটির কথা এখন আর কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয়না। গত আট বছর আগে এই গ্রামের ব্যবসায়ী লিটন শিকদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দূর্গাপূজা উপলক্ষে তার মন্ডপে প্রথমবার ১৫১টি প্রতিমা তৈরি করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেন। তারপর থেকে প্রতি বছরই এই মন্ডপে প্রতিমার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এবছর পবিত্র ধর্মগ্রস্থ রামায়ণ, পুরাণ ও মহাভারতের নানা দেবদেবীর কাহিনী অবলম্বনে এই পূজা মন্ডপে মোট ৭০১টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিমা দেখতে আসা ভক্ত দর্শনার্থীরা বলেন, সনাতন ধর্মের রামায়ণ ও মহাভারতে ধর্মের যে কল্পকাহিনী রয়েছে তা প্রতিমার মাধ্যমে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মের অনেক অজানা কাহিনী জানতে পারছি। আমরা সত্যি অভিভূত। ভিড় এড়াতে তাই পূজা শুরুর আগেই শিকদারবাড়ির আয়োজন দেখতে এসেছি।
ভারতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থী পূর্ণচন্দ্র মাইতি এবং উজ্জ্বল মন্ডল বলেন, আগে জানতাম কোলকাতায় দূর্গাপুজায় বড় আয়োজন হয়ে থাকে কিন্তু বাংলাদেশের আয়োজন দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। আমাদের একটা ভুল ধারনা ছিল যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা দূর্গাপুজা সেভাবে করতে পারেনা। কিন্তু আমাদের সেই ধারনা আজ পাল্টে গেল এই মন্ডপ দেখে। এখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে এতো বড় করে আয়োজন করে থাকে তা জানতাম না। সত্যিই আমরা মুগ্ধ হয়েছি।
আয়োজক ব্যবসায়ী লিটন শিকদার এই প্রতিবেদককে বলেন, নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরে আমার জন্ম। আজ পাড়াগাঁতে আমার বেড়ে ওঠা। আমার বাবা ছিলেন গ্রাম্য শৈল্য চিকিৎসক। জীবিকার তাগিদে আমি এক সময়ে বিদেশে পাড়ি জমাই। ছেলেবেলা থেকে আমি ধর্মপরায়ণ ছিলাম। আমার ইচ্ছাছিল আমি যদি কখনো বেশি টাকা রোজগার করতে পারি তাহলে আমার জন্মভূমিতে বছরে একবার বড় ধর্মীয় উৎসব করব। ঈশ্বর আমাকে বৈমূখ করেননি। তাই আমি ২০১০ সালে প্রথমে ১৫১টি দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করে শুরু করি। ঈশ্বররের ইচ্ছায় আমি এধরনের আয়োজন করতে পারছি। বাগেরহাট সেই থেকে দূর্গাপূজা আসলে এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা তা দর্শন করতে আসেন।
তিনি আরও বলেন, এখানে পুজা দেখতে আসা দর্শনার্থীদের পরিদর্শনে বইয়ে দেয়া মতামতের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে এই মন্ডপে প্রতিমার সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ানো হচ্ছে। এবছর ৭০১টি দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিকাল মিলিয়ে সনাতন ধর্মে কোটি কোটি দেবতা রয়েছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই দেবতাদের সম্পর্কে সবাই জানেননা। সনাতন ধর্মের ব্যাপকতা কত তা সবার কাছে তুলে ধরতে আমার এই আয়োজন।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বলেন, বাগেরহাট জেলায় এবছর ৬২২টি মন্ডপে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পাশাপাশি সিসি ক্যামেরায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া হবে। দেশের সবচেয়ে বড় দূর্গাপূজা হচ্ছে হাকিমপুর গ্রামের শিকদার বাড়িতে। এখানে দেড় শতাধিক পুলিশ মোতায়েন থাকছে বলে জানালেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।