মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরিয়ে চূড়ান্ত অবমাননার ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহে। গত দুই বছরের ব্যবধানে এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো স্মৃতিস্তম্ভটিতে ভাঙচুর কিংবা বিকৃত করার ঘটনা ঘটল। এ ঘটনার একটি ভিডিও ও স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আব্দুর রহমান সম্রাট নামে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না বা কী উদ্দেশ্যে এই ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা রিমান্ডে এনে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’-এ মঙ্গলবার সকালে ভাস্কর্যটির মাথায় একটি জুতার মালা ঝুলতে দেখেন স্থানীয়রা। এর পাশেই একটি সাইনবোর্ডে ‘স্মৃতিস্তম্ভ এর মেরামত কাজ চলছে’ লেখা রয়েছে। ২০১৯ সালের মার্চে উদ্বোধন হওয়া এই ভাস্কর্যটিতে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই একের পর এক হামলা চলছে। সর্বশেষ গত ১৩ জুলাই একটি চক্র ভাস্কর্যটি ভাঙচুরের চেষ্টা চালালে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা দীর্ঘসূত্রতায় রূপ নিয়েছে। কার্যকর সুরক্ষার অভাবেই বারবার এমন ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ এ ঘটনার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমীর আলী আজম মো. আবু বকর একে ‘কুচক্রী মহলের গভীর ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই ঘটনাটি আবারও দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বেহাল দশা এবং নিরাপত্তার সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় প্রায় দেড় হাজার মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ম্যুরাল ও স্মৃতিফলক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এসব স্থাপনার পুনর্বাসনে তেমন অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আট মাস অতিক্রান্ত হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান সংস্কার না হওয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স দুই বছর ধরে অরক্ষিত ও সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্যের বদলে ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, বীরশ্রেষ্ঠদের অপমান মানে মুক্তিযুদ্ধের অপমান; স্থাপনাগুলো পুনঃনির্মাণে সরকারের আরও জোরালো ভূমিকা কাম্য ছিল। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান অবশ্য জানিয়েছেন, সরকার এসব স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দোষীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
সূত্র: বিবিসি বাংলা ও স্থানীয় প্রশাসন