সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। নতুন এই বেতন আদেশ গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের মূল বেতন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
তবে নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হলেও সরকারি কর্মচারীরা একবারে পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ বর্তমান প্রাপ্ত বেতনের সঙ্গে যোগ করে পাবেন।
এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বেতন বৃদ্ধির ৭০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে বর্ধিত বেতন পাবেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করার কথা রয়েছে। নতুন আদেশ অনুযায়ী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের তারিখ হবে প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী ২০তম গ্রেডে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকায় একই গ্রেডে মোট বেতন হবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা। ২০ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া, ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা, ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা এবং ১৫০ টাকা মুঠোফোন ভাতা যুক্ত হবে। ঢাকার ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার হার ৬০ শতাংশ।
বিশেষ গ্রেডে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, মুঠোফোন ও ধোলাই ভাতা যোগ হয়ে মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর বাইরে তাঁরা সার্বক্ষণিক গাড়িসুবিধাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। প্রথম গ্রেডে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ টাকা এবং নবম গ্রেডে সর্বনিম্ন মোট বেতন হবে ৬০ হাজার টাকার কিছু বেশি।
নতুন বেতন আদেশে পদোন্নতির সুযোগ না থাকলেও একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক হলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনও নতুন কাঠামোয় পাঁচটি স্তরে বাড়ানো হয়েছে। তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বেড়ে ১৮ হাজার টাকা হবে। অন্যদিকে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নিট পেনশন সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
বয়সের ভিত্তিতে পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ দুই সন্তানের ক্ষেত্রে মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা রাখা হয়েছে। ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা শিক্ষাসহায়ক ভাতার বিধানও রয়েছে। বাংলা নববর্ষ ভাতা ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২০ শতাংশ।
এ ছাড়া পাহাড়ি, হাওর, চর ও দ্বীপাঞ্চলে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতার বিধান রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নতুন বেতন আদেশে কর্মস্থল ও গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার নির্ধারণ করা হলেও এসব নতুন হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। তার আগে সরকারি কর্মচারীরা প্রচলিত হারেই বাড়িভাড়া পাবেন। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে ৬০ শতাংশ, ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৫ থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১ থেকে ৪র্থ গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন অনলাইনে আইবাস++-এর ‘পে ফিক্সেশন’ অপশনের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করতে হবে।
তবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।