যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতির মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ার পথে এগোচ্ছে কানাডা। এমনকি ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর কানাডীয় কর্মকর্তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক জোট আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কানাডীয় ও ইউরোপীয় কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কানাডাকে ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ বা সহযোগী সদস্য করার প্রস্তাব নিয়েও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ঐতিহাসিকভাবে ইইউ পৃথক দেশকে এ ধরনের নমনীয় সদস্যপদের সুযোগ দেয় না। ফলে কানাডার জন্য এমন ব্যবস্থা তৈরি হলে তা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম। সম্ভাব্য এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে কয়েক দশকের মধ্যে কানাডার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় পুনর্বিন্যাস ঘটতে পারে।
কানাডার বাণিজ্যিক বাস্তবতায় এই উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক। ২০২৫ সালে দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। ফলে ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘদিনের বিপুল বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপের দিকে ঝুঁকে পড়া কানাডার জন্য বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আলোচনা সফল হলে কানাডা ও ইইউর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে ইউরোপে সার পরিবহন এবং নতুন প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ইউরোপের রুশ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
জ্বালানি ও পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে দুই পক্ষ। নতুন সমুদ্রতলের কেবল স্থাপন, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আটলান্টিকের দুই পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় এসব উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ইউরোপের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত যোগাযোগও রয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্নি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁসহ ইউরোপের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
কানাডীয়দের ইউরোপে ভিসা ছাড়াই বসবাস ও কাজের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও ম্যাক্রোঁর সঙ্গে কার্নির আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি ‘স্টাডি অ্যাব্রড প্রোগ্রাম’-এ কানাডাকে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন তিনি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে থাকে।
আগামী সপ্তাহে কার্নির ইউরোপ সফরকে ঘিরেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের লিভারপুল ও ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ সফর করবেন। এ সময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি ‘স্টেট অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’ ভাষণেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তায় কানাডা–ইইউ সম্পর্ক জোরদার নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন কার্নি। তবে সফরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগী সদস্য হওয়ার বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কানাডার এই ইউরোপমুখী তৎপরতার পেছনে মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য বিরোধ। আগস্টে কার্নি কানাডীয় আলোচকদের মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে চলমান আলোচনা থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন। এরপর দুই দেশ একে অপরের পণ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন সংঘাত আরও বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার কিছু দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন পণ্য নিষিদ্ধ করেন। পাশাপাশি কানাডীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা বোম্বার্ডিয়ারের বিদেশে তৈরি বিমান যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেন।
২০২৫ সালে আবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প কানাডাকে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ ও উপহাস করে আসছেন। বাণিজ্য বিরোধের মধ্যেই আগস্টে অন্টারিও লেকের সরকারি নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার উদ্যোগও নেন তিনি।
ফলে কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সংকট এখন আর শুধু বাণিজ্য ও শুল্কনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত দূরত্বও যুক্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কানাডার জন্য শুধু নতুন বাজার খোঁজার উদ্যোগ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঝুঁকি কমানো, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে বিকল্প অংশীদার তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় নতুন পথ তৈরির কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বিপুল বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে এই পুনর্বিন্যাস কতটা দ্রুত ও গভীরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।