জার্মানির ব্যস্ত নগরী ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘বৈশাখী মেলা’। কয়েকজন সংস্কৃতিমনা বাংলাদেশি নারীর উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য যেন এক টুকরো বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল। দিনব্যাপী আয়োজনে দেশীয় সংস্কৃতির বর্ণিল উপস্থাপনা, বৈশাখী র্যালি, বাহারি খাবারের স্টল, রঙিন দেশীয় পোশাকের প্রদর্শনী ও বিক্রয়, গান-কবিতা-নৃত্যে সাজানো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং আন্তরিক মিলনমেলা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন দিলশাদ জাহান খান। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন পারভিন জাহাঙ্গীর, ডায়মণ্ড হীরা, চৈতি বানোয়ারি ও ইয়াসমিন আহমেদ। আয়োজকদের ভাষ্য, এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল জার্মানিতে নতুন নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চাকে আরও গতিশীল করা।
বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা ও দক্ষ সংগঠনের মাধ্যমে পুরো আয়োজনটি পায় ভিন্নমাত্রা। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতি তুলে ধরার আন্তরিক প্রচেষ্টা উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্টলগুলোর শৈল্পিক ও সৃজনশীল নামকরণ। প্রতিটি স্টল নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। পোশাকের স্টলগুলোতে ছিল দেশীয় ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও আধুনিকতার মেলবন্ধন।
“সাজের প্রহর” স্টলে উদ্যোক্তা দিলশাদ জাহান খান উপস্থাপন করেন দৃষ্টিনন্দন দেশীয় পোশাকের সংগ্রহ। শাড়ি, থ্রি-পিস, গহনা ও ফ্যাশন সামগ্রীতে ছিল আভিজাত্যের ছোঁয়া। দর্শনার্থীরা দেশীয় ফ্যাশনের সৌন্দর্য উপভোগ করেন প্রাণভরে।

“রিকস্টিউম জার্মানি বাই টুম্পা” স্টলে ছিল নারীদের সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যচর্চার নানা আকর্ষণীয় উপকরণ। আধুনিকতার সঙ্গে দেশীয় রুচির সমন্বয় স্টলটিকে দর্শকদের অন্যতম পছন্দের কেন্দ্রে পরিণত করে।
“ফৌজিয়া’স ক্লোসেট”-এ ফৌজিয়া শেখ উপস্থাপন করেন ট্রেন্ডি ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মনোমুগ্ধকর সমাহার। অন্যদিকে “ব্লিসফুল বিউটি বাই নাদিয়া”-তে ছিল বৈচিত্র্যময় পোশাক ও অলংকারের সংগ্রহ, যা বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
খাবারের স্টলগুলোও ছিল উৎসবের প্রাণ। পুরো আয়োজনজুড়ে ভেসে বেড়ায় দেশীয় মশলা, চা ও মিষ্টির সুবাস। যেন প্রবাসের মাটিতে ফিরে এসেছে বাংলাদেশের বৈশাখী আবহ।
“খাই দাই (বিরিয়ানি)” স্টলে পারভিন জাহাঙ্গীর পরিবেশন করেন সুস্বাদু বিরিয়ানি। দর্শনার্থীদের অনেকে বলেন, প্রবাসে থেকেও এমন দেশীয় স্বাদের খাবার পাওয়া সত্যিই বিরল।
ডায়মণ্ড হীরার “টক ঝাল উৎসব ঘর” ছিল নামের মতোই ব্যতিক্রমী। টক, ঝাল ও মশলাদার দেশীয় খাবারে ভরপুর স্টলটিতে ছিল দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়।
“মিষ্টি ছোঁয়া বাই মিতা”-তে ইয়াসমিন আহমেদ নিয়ে আসেন নানা ধরনের দেশীয় মিষ্টান্ন, পিঠা ও ডেজার্ট। রঙিন আয়োজন যেন শৈশবের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনে দর্শকদের মনে।
শম্পা আহমেদের “মুসাওয়ির’স ফান” শিশু-কিশোর ও পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দঘন আয়োজন হিসেবে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এতে অংশ নেন দীপা হাওলাদারও।
অন্যদিকে “মজুমদার চায়ের স্টল”-এ শিরীন মজুমদারের পরিবেশিত ধোঁয়া ওঠা চা জমিয়ে তোলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আড্ডা। “খিচুরি কর্নার”-এ ফৌজিয়া হকের পরিবেশিত দেশীয় খিচুরি ও ভর্তা দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল পুরো আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র। গান, কবিতা ও নৃত্যে সাজানো পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিকে দেয় শিল্পসুষমার অনন্য মাত্রা।
সংগীতে অংশ নেন রিয়েল আনোয়ার, নিম্মি কাদের, মুক্তা খান, বাবুল খান ও বাবুল তালুকদার। বাংলা আধুনিক গান, লোকসংগীত ও আবৃত্তির মিশেলে তাদের পরিবেশনা প্রবাসীদের মনে জাগিয়ে তোলে দেশের স্মৃতি ও আবেগ।
নৃত্যে অংশ নেন আয়েশা জামান আরশিকা। তার মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা পুরো অনুষ্ঠানে এনে দেয় নান্দনিক আবহ।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন নুরল আকন্দ খোকন। প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও দর্শকদের সঙ্গে আন্তরিক সংযোগের মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানটিকে আরও উপভোগ্য করে তোলেন।

সব মিলিয়ে ‘বৈশাখী মেলা’ শুধু একটি উৎসব নয়, বরং প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের হৃদয়ের সংযোগস্থলে পরিণত হয়। এখানে মানুষ শুধু কেনাকাটা বা খাবারের স্বাদ নিতে আসেননি, বরং নিজেদের শেকড়, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নতুন করে অনুভব করেছেন।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এ ধরনের আয়োজন প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা ও একঘেয়েমির মধ্যে স্বস্তির পরশ এনে দেয়। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতি তুলে ধরতেও এমন উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দিলশাদ জাহান খানসহ আয়োজকরা জানান, এ ধরনের উদ্যোগ জার্মানিতে নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং প্রবাসে নতুনধারার সৃজনশীল বাণিজ্যিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।