প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা ধরে রাখতে জার্মানিতে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ “কচিকাঁচার বর্ণমালা অনলাইন স্কুল”। ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি স্টুটগার্টের মিনহাজ উদ্দিন দীপন,এবিএম বায়েজীদ, মো,মনিরুজ্জামান ,ফায়সাল ইমাম ও রেজা কামরান চৌধুরী এই ৫জন প্রবাসী বাংলাদেশি বন্ধুর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই অনলাইন স্কুলে বর্তমানে জার্মানির বিভিন্ন শহরের প্রায় ৯০ জন শিশু-কিশোর নিয়মিত বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করছে।
করোনাকালীন সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা যখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তখনই স্টুটগার্টে বসবাসরত পাঁচ বন্ধু উপলব্ধি করেন—অনলাইনের মাধ্যমে প্রবাসী শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা শেখানো সম্ভব। শুরুতে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে গুগল মিটের মাধ্যমে প্রথম ক্লাস চালু হয়। শিশুদের আগ্রহ ও অভিভাবকদের উৎসাহে ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ বড় পরিসর পায়।

বর্তমানে স্কুলটিতে প্রাথমিক পর্যায়ের ১০টি ব্যাচ চালু রয়েছে। প্রতি বছর এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে নতুন ব্যাচে ভর্তি নেওয়া হয়। পাঠ্যক্রম হিসেবে বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড অনুমোদিত “আমার বাংলা বই” অনুসরণ করা হয় এবং প্রতি রবিবার সকালে নিয়মিত অনলাইন ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দুই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সফলভাবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা সম্পন্ন করেছে। মোট ১০ জন শিক্ষার্থী পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলা শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে স্কুলটির প্রথম প্রাথমিক সমাপনী সম্পন্নকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
শুরুতে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্তমানে ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক ব্যাচ এবং ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরীক্ষামূলক ব্যাচও চালু হয়েছে। শুধু বাংলাদেশি নয়, কয়েকজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীও এখানে বাংলা ভাষা শিক্ষা নিচ্ছে।
স্কুলটির অন্যতম বিশেষ দিক হলো “অভিভাবক-শিক্ষক” ব্যবস্থা। প্রতিটি শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের একজনকে পর্যায়ক্রমে ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়। নতুন শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়। বর্তমানে স্কুলটিতে ৭২ জন অভিভাবক-শিক্ষক এবং প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক যুক্ত রয়েছেন।
শিশুদের কাছে বাংলা শেখাকে আনন্দদায়ক করতে বিভিন্ন সৃজনশীল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। বাংলা বর্ণমালা শেখানোর পাশাপাশি কবিতা, গান, একুশের গান, জাতীয় সংগীত এবং বাংলাদেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে স্টুটগার্টে প্রথম সরাসরি মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও খেলাধুলায় অংশ নেয়। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মিলনমেলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথম তিন বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করেনি। তবে কার্যক্রমের পরিধি বাড়ায় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি সেমিস্টারে প্রতিজনের জন্য ১৫ ইউরো নির্ধারণ করা হয়। এই অর্থ প্রযুক্তিগত ব্যয়, সনদপত্র মুদ্রণ, স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের সম্মাননা ও বিভিন্ন আয়োজনের খরচে ব্যবহৃত হয়।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, প্রবাসী শিশু- কিশোরদের বাংলা ভাষায় কথা বলতে, লিখতে ও পড়তে পারা তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ভবিষ্যতেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।