সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলা একজন মানুষের কিছু গল্প থাকে যেগুলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমানা ছাড়িয়ে এক প্রজন্মের স্মৃতিতে পরিণত হয়।আকবর হায়দার কিরন-এর “কিছু কবিতা ও জীবনের গল্প” তেমনই এক অনন্য গ্রন্থ, যেখানে জীবন, সময় এবং অনুভূতির বহুমাত্রিক প্রতিফলন ধরা পড়েছে সংবেদনশীল ও সাবলীল ভাষায়।
সংবাদ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখক এখানে যেন এক গল্প-শিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁর কলমে উঠে এসেছে মানুষের না-বলা কথা, সমাজের নীরব স্পন্দন, এবং সময়ের অন্তর্লীন টানাপোড়েন।
গ্রন্থটি বিন্যাসের দিক থেকেও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। “প্রথম পর্ব: কবিতার ক্যানভাস”-এ ধরা পড়ে প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসার স্মৃতি এবং অন্তর্গত বেদনার মৃদু অনুরণন। আর “দ্বিতীয় পর্ব: গল্পের গ্রন্থনা”-য় উঠে এসেছে শৈশবের নির্ভার দিন, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, সাংবাদিকতার অন্তরালের গল্প, এবং প্রবাসে গড়ে ওঠা সম্পর্কের জটিলতা ও সৌন্দর্য।
কুমিল্লার মাটির গন্ধ থেকে শুরু করে ঢাকার সংবাদপত্রের ব্যস্ততা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে নিউইয়র্কের জীবন এই দীর্ঘ যাত্রাপথ বইটিতে রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত দলিলে। এখানে যেমন আছে মোহন দাদার সুরেলা স্মৃতি, তেমনি আছে ভয়েস অব আমেরিকার সোনালি যুগের ছোঁয়া; আছে নিউইয়র্কের বইমেলার আবহ, আবার আছে জ্যাকসন হাইটসের কফিশপের প্রাণবন্ত আড্ডা।
লেখকের বিশেষ শক্তি তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি কেবল ঘটনা বর্ণনা করেন না-তিনি অনুভূতিকে শব্দে রূপ দেন। ফলে পাঠক ধীরে ধীরে লেখকের অভিজ্ঞতার ভেতর প্রবেশ করেন এবং একসময় নিজেকেও সেই গল্পের অংশ বলে মনে হয়।
প্রকাশক অনন্যা-র মনিরুল হকের যত্নশীল প্রকাশনা এবং প্রচ্ছদশিল্পী মোস্তফা কারিগর-এর নান্দনিক প্রচ্ছদ এই বইটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা – যা পাঠের আগেই পাঠককে আকৃষ্ট করে।
সবশেষে বলা যায়, “কিছু কবিতা ও জীবনের গল্প” কেবল একটি বই নয়; এটি এক জীবনের প্রতিচ্ছবি, যা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রূপ দিয়েছে সমষ্টিগত স্মৃতিতে। এই বই পাঠককে শুধু গল্প শোনায় না – তাকে ভাবায়, ছুঁয়ে যায়, এবং কোথাও না কোথাও নিজের জীবনের প্রতিফলন খুঁজে নিতে সাহায্য করে। নিউ ইয়র্কের ৩৫তম আন্তর্জাতিক বইমেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে আকবর হায়দার কিরনের এই নতুন প্রকাশনা ।