সম্পাদকীয় : সম্প্রতি বাংলাদেশে একের পর এক মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং নৃশংস সহিংসতার ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—এগুলো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ, যা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রের কার্যকর ব্যর্থতার ফল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঘটছে নিজ বাড়িতে, পরিচিত মানুষের হাতে কিংবা এমন পরিবেশে, যেখানে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় সরাসরি রাষ্ট্রের। অথচ প্রতিবারই আমরা দেখি একই চিত্র: ঘটনার পর ক্ষণিকের শোক, কিছু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, তারপর সব ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি। সরকার বারবার আশ্বাস দেয়, কিন্তু বাস্তবে নারীর জীবনে নিরাপত্তার কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে না।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নতুন নয়, কিন্তু এর নৃশংসতা ও ব্যাপ্তি যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। তদন্ত আছে, কিন্তু বিচার নেই। বিচার আছে, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেই। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
সরকার নারী উন্নয়নের গল্প শোনাতে ভালোবাসে—নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব—সবই প্রচারনির্ভর সাফল্য। কিন্তু একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে রাষ্ট্র তার নারী ও শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে তার মাধ্যমে। সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশ আজ চরমভাবে ব্যর্থ।
আরও উদ্বেগজনক হলো, ভুক্তভোগী নারীকেই প্রায়শই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়—পোশাক, চলাফেরা, সামাজিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই মানসিকতা শুধু সমাজের নয়, রাষ্ট্রের নীরব প্রশ্রয়েই টিকে আছে। সরকার যদি সত্যিই নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইত, তবে শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনের সর্বস্তরে এই পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিত।
আজ প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি তবে কেবল লাশ গোনার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে? একজন মা তার সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ নয়, একটি মেয়ে তার নিজের শরীর নিয়ে নিরাপদ নয়—এমন দেশে উন্নয়নের স্লোগান কতটা অর্থবহ?
এখন আর শোকবার্তা বা প্রতিশ্রুতির সময় নয়। প্রয়োজন দ্রুত, কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পুলিশি জবাবদিহি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এসব ছাড়া নারীর রক্তপাত বন্ধ হবে না।
ইতিহাস ক্ষমা করে না। রাষ্ট্র যদি আজও নীরব থাকে, তবে এই নীরবতাই একদিন সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে।