আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে দিবসটি এসেছে, যখন প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং যুদ্ধ-সংঘাতের বাস্তবতায় সাংবাদিকতা পেশা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের বিবেক, রাষ্ট্রের আয়না এবং জনগণের কণ্ঠস্বর। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোকে জবাবদিহির আওতায় আনে, দুর্নীতি ও অনিয়ম উন্মোচন করে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে এবং মানবাধিকারের সংকট গভীরতর হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার গণমাধ্যমকে যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন সংকটও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু একইসঙ্গে বাড়ছে গুজব, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার। ফলে সাংবাদিকতার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দ্রুততার সঙ্গে সত্যতা নিশ্চিত করা। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানি, হুমকি, কারাবরণ এমনকি প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অস্থিরতার অঞ্চল—সত্য তুলে ধরতে গিয়ে বহু সাংবাদিক জীবন দিচ্ছেন। এটি শুধু সংবাদমাধ্যমের সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কারণ সত্যকে দমন করা মানে সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।
বাংলাদেশেও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রা অর্জন করেছে। প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে সংবাদপ্রবাহ বহুমাত্রিক হয়েছে। তবে একইসঙ্গে সাংবাদিকতার পেশাগত মান, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা। গণমাধ্যমকে হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও জনস্বার্থনির্ভর।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হবে এবং গণমাধ্যম জনগণের আস্থা অর্জনে আরও পেশাদার ও নৈতিক ভূমিকা পালন করবে। একইসঙ্গে পাঠক-দর্শকদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে যাচাইবিহীন তথ্য বা অপপ্রচারের শিকার না হন।
সত্যের অনুসন্ধান কখনো সহজ ছিল না। তবুও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ থেমে থাকে না। কারণ মুক্ত গণমাধ্যমই পারে সমাজকে আলোকিত করতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।