নিউইয়র্ক, ২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ পরিষদের তৃতীয় দিনের বিকেলের অধিবেশনে ১৮ জন বক্তার মধ্যে তিনি ১১তম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন। প্রায় এক দশক পর জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হয়।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবাধিকার ও মানবিক সংকট, অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ভাষণের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে তাকে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। বিদায়ী সভাপতি এনালেনা বেয়ারবকের নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেন তিনি।
এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সংঘাতের প্রভাব বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অন্যান্য দেশেও পড়ে। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছে।
তিনি বলেন, সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অবিচল। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিও বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। তাদের নিরাপদে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র সমাধান। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সমর্থন এবং প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। তাই জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আসন্ন COP-31-এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
নিজেদের জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্ন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরেন তিনি।
ভাষণে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের বিভিন্ন পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে চলতি অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও জানান তিনি।
নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোটের গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ। এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের এআই বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে চায় যেখানে তরুণরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ।”
বিশ্ব মানবতার প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সূত্র: প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ ভাষণের পূর্ণ পাঠ