সম্পাদকীয় : বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক, অস্ত্র বহন থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড—বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার খবর প্রায়ই সামনে আসছে। এতে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই প্রশ্নের মুখে পড়ছে না, সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগে রয়েছেন অভিভাবকেরা। একটি সমাজে বাবা-মা যদি সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে কিংবা বাইরে বের হতে দিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তবে সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
কিশোর অপরাধের বিস্তারের পেছনে মাদকের সহজলভ্যতা, অপরাধী চক্রের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা, শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা, সুস্থ বিনোদনের অভাবসহ নানা কারণ রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কিশোরদের একটি অংশকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র নানা ধরনের অপরাধ পরিচালনা করছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ফলে বিষয়টিকে শুধু কিশোরদের অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ অদৃশ্য থেকে যাবে।
এখানেই সরকারের দায় সবচেয়ে বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ শুধু অপরাধ সংঘটনের পর অভিযান চালানো নয়; অপরাধের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করাও তাদের দায়িত্ব। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা চললে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো এতদিন কী করেছে? অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তৎপরতা দেখানো যথেষ্ট নয়; নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আগেই সক্রিয় হতে হবে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধের বিস্তার যদি প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে? সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি মাদক, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার জবাবদিহি অবশ্যই থাকা উচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। জনগণ জানতে চায়—অপরাধের মূল উৎস কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং কেন বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে?
বিশেষ করে মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিশোরের হাতে মাদক পৌঁছানোর আগে জানতে হবে এর উৎস কোথায়, কারা সরবরাহ করছে এবং কারা এর পেছনে অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। শুধু মাদকসেবী কিশোরকে আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা সরবরাহকারী ও সংঘবদ্ধ চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক এবং প্রভাবমুক্ত।
কিশোর অপরাধ দমনে শুধু পুলিশি অভিযানও যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি। যারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বয়স ও অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে কিশোরদের ব্যবহার করে যারা অপরাধ পরিচালনা করে, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। কোনো কিশোরকে সামনে রেখে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা যদি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে, তাহলে শুধু কিশোরকে আটক করে প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে রাখলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। অপরাধের নেপথ্যকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই হবে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।
সরকারের কাছে এখন মানুষের একটাই প্রত্যাশা—নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে অভিভাবক যেন আতঙ্কে না থাকেন, কোনো কিশোর যেন মাদক ও অপরাধী চক্রের সহজ শিকার না হয় এবং অপরাধীরা যেন কোনো প্রভাবের কারণে আইনের বাইরে থাকতে না পারে—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধী ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অপরাধের এমন পরিবেশ তৈরি হতে না দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কিশোর অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার প্রশ্ন। তাই সরকারকে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। জনগণ এখন আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান নিরাপত্তা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দেখতে চায়।