জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
মঙ্গলবার (১ জুলাই) সকাল পৌণে ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)- ১ এ এই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
শুনানির শুরুতেই চিফ প্রসিকিউটর (রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌসুলি) তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট পর্যন্ত।
মি. ইসলাম তার বক্তব্য উপস্থাপনের সময় একটা বড় অংশ জুড়ে শেখ হাসিনার বাবা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গে কথা বলেন। খবর ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (বিবিসি) বাংলা নিউজের।
শেখ হাসিনার ‘কৃত অপরাধের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য’ বর্ণনা করতে গিয়ে তাজুল বলেন, “বাংলাদেশে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা ছিল শেখ হাসিনার। তার পিতাও চেয়েছিল এমনটা।”
“আওয়ামী লীগ মনে করে শেখ মুজিবই বাংলাদেশের স্বাধীনতার একক কৃতিত্বের দাবিদার” উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর মি. ইসলাম বলেন, “পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা সব রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় শেখ মুজিবের ছবি রাখতে বাধ্য করেন। তার জন্ম-মৃত্যু দিবস পালনে বাধ্য করেন।”
এ মামলার তিন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক রয়েছেন। পলাতক দুই জনের পক্ষে আইনি লড়াই করতে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আমির হোসাইন।
কিন্তু মি. হোসাইন শুনানির জন্য প্রস্তুত হতে ১৫ দিন সময় আবেদন করলে এক সপ্তাহ সময় মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল। আগামী সোমবার (৭ জুলাই) এ মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আমির হোসাইন। ছবি: সংগৃহিত
আরেক আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের উপস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগ উত্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মি. তাজুল ইসলাম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এজলাসে আসামিদের জন্য গারদে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের এই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
সাদার ওপরে লাল-কালো চেক শার্ট পরে এসেছিলেন তিনি। চিফ প্রসিকিউটর যখন অভিযোগ উত্থাপন করছিলেন তখন তিনি শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
এক পর্যায়ে বিমর্ষ ও মাথা নিচু করে থাকতে দেখা যায় তাকে।
ট্রাইব্যুনালের এই শুনানি দ্বিতীয় দিনের মতো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
চিফ প্রসিকিউটর মি. ইসলাম শুনানিতে বলেন, “শেখ হাসিনা পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় সারা দেশে শেখ মুজিবের বন্দনায় ভাস্কর্য, ছবি স্থাপনের জন্য রাষ্ট্রের চার হাজার কোটি টাকা খরচে বাধ্য করে। সংবিধান সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রীর (তার) ছবি সব সরকারি কার্যালয়ে রাখার বিধান চালু করে।”
পরে তিনি শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ট্রাইব্যুনালে।
তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্রের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের” দায় আনা হয়েছে এসব অভিযোগে।
গত বছরের ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন মি. ইসলাম।
এছাড়া শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার চাঁনখারপুলে গুলি করে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আশুলিয়ায় ভ্যানে ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলা, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদ হত্যার অভিযোগও রয়েছে এই তিনজনের বিরুদ্ধে।
শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আরজি জানান।
শুনানির পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা পাঁচ অভিযোগ সঠিক হয়নি, খালাস চেয়ে আবেদন করবেন তিনি।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক না
পলাতক শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আমির হোসাইন শুনানির পর এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা পাঁচ অভিযোগ সঠিক হয়নি, খালাস চেয়ে আবেদন করবেন তিনি।
মি. হোসাইন বলেন, “আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে তাকে এই মামলা থেকে খালাস করার জন্য। আমি মনে করি তার বিরুদ্ধে যে পাঁচটি চার্জ আনা হয়েছে এ চার্জগুলো সঠিক হয় নাই। সঠিক না বিধায় আমি ডিসচার্জের আবেদন দেব।”
“বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আর এ রকম মামলা হয়নি” উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে এ মামলাটিকে ঐতিহাসিক বলে দাবি করেছেন তিনি।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ রকম কোনো মামলা আর হয়নি। আমি বোঝাতে চাইছি, অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ রকম কোনো মামলা হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ রকম কোনো মামলা হয়নি।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো “কঠিন গুরুতর চার্জের মামলা” উল্লেখ করে মি. হোসাইন বলেন, “এই কারণে আমি প্রস্তুতির জন্য সময় চেয়েছি। এই পাঁচটি চার্জ লাই করবে না।”
শুনানির জন্য প্রস্তুত হতে মি. হোসাইনের করা ১৫ দিনের সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে এক সপ্তাহ সময় মঞ্জুর করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
পরে আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের আইনজীবী জায়েদ বিন আমজাদ মামলার অভিযোগ গঠনের এ পর্যায়ে কোনো শুনানি করবেন না বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান।
অভিযোগ গঠনের পরে মি. আমজাদ শুনানি করার আবেদন করলে তা মঞ্জুর করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গত পহেলা জুন শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
এর আগে ১২ মে তদন্ত সংস্থা ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন, সেই ট্রাইব্যুনালেই এখন এই বিচার হতে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিউশন, তদন্ত দলসহ সার্বিকভাবে পরিবর্তন আনা হয়।
এই প্রসিকিউশনের অনেকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনাও রয়েছে।
যদিও এর আগে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিলের সময় চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, “এখনকার বিচার অতীতের প্রতিশোধ নয়।”