বাংলাদেশের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার বিরুদ্ধে করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাকে ‘আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ’উল্লেখ করেছেনে তার আইনজীবী।
নুরুল হুদার আইনজীবী বলেছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের মতো সংবেদনশীল মামলা সরকারের পূর্বানুমতিতে করতে হয়। এটি ব্যক্তি পর্যায়ে দায়ের করা আইনত বৈধ নয় এবং এটি একটি বিরল ঘটনা।
শুক্রবার (২৭ জুন) ঢাকা মহানগর হাকিম আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে রিমান্ড শুনানিকালে এ কথা বলেন এ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম সজিব, যিনি নূরুল হুদার নিযুক্ত আইনজীবী।
চার দিনের রিমান্ড শেষে এদিন নূরুল হুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরো ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামসুজ্জোহা সরকার।
বিকাল পৌণে চারটার দিকে নূরুল হুদার মামলার শুনানি শুরু হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক ফের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানিতে যা বললেন আইনজীবীরা
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে বলেন, “নূরুল হুদার মামলাটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ। আসামি একজন দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন। আসামির সময় ফ্যাসিস্ট সরকারের জন্ম হয়। নির্বাচনের সময় সারা দেশে ডিসি, এসপি নিয়োগ, হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ, ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগী করা। এসব বিষয়ে সল্প সময়ের মধ্যে জিজ্ঞেসাবাদ করা সম্ভব নয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে তথ্য বের করা কষ্টকর।”
পিপি বলেন, “নির্বাচনের সময় তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে পিটিয়েছে। গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে। বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ধরে নেওয়া হয়েছে। সেই বিষয়ে অনেকেই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে অভিযোগ দিলেই কোনো কাজ করেননি। তাদের বাড়ি ভাঙচুর, মারধর করা হলেই আইনগত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আসামি ২০১৮ সালে রাত ৩টার মধ্যে ২০০ জন এমপির নাম ঘোষণা করেছেন। সেই বিষয়ে জিজ্ঞেসাবাদ করা প্রয়োজন। দিনের ভোট রাতে কারা করেছেন, কারা কারা জড়িত সেটাই জানা দরকার।”
তিনি আরো বলেন, “এই পাতানো নির্বাচনে দাপ্তরিক সহযোগী, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা কী আশ্বাস দিয়েছে? কারা কারা জড়িত ছিলো। পূর্বের কোন কমিশনার জড়িত, সহযোগিতা করেছিলো কি না, তা জানা দরকার। নির্বাচন নিয়ে আর্থিক বাজেট থাকে। ফ্যাসিস্ট সরকার আমলে কী পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে, লুটপাট করেছে তা জানা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে বিবেচনা করে আসামির দশ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করছি।”
মামলায় ত্রুটির কথা বললেন আসামিপক্ষের আইনজীবী
এরপর নূরুল হুদার পক্ষে তৌহিদুল ইসলাম সজিব শুনানি করেন। তিনি বলেন, “গত ২৩ জুন রিমান্ড আবেদন ও আজকের রিমান্ড আবেদনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। একই আবেদনে একটু ঘুরিয়ে পেচিয়ে করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৩ তারিখ ধারাগুলো জামিনযোগ্য ছিলো। জামিনযোগ্য ধারায় জামিন না দিলে আদালতের ক্ষমতা খর্ব হবে। পরে তারা আরো তিনটা ধারা সংযোজনের আবেদন করলেন। এখন কথা বলতে ভয় লাগে, দেখা যাবে আবারো নতুন করে ধারা যোগের আবেদন করা হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “আসামি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কখন রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করলেন? এই মামলার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা রয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে হলে অবশ্যই সরকারে অনুমতি নিতে হবে।”
তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “মামলার তদন্ত কর্মকর্তার এই ধারা সংযোজনের সুযোগ নেই। আইনগতভাবে এই মামলাটি ত্রুটিপূর্ণ। আসামি নূরুল হুদার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট, সু-স্পষ্ট, দায় সৃষ্টিকারী কোনো অভিযোগ নেই। তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমান্ডে নিয়ে কী করেছেন, তা লিখতে হবে। সেই কথা রিমান্ড ফরোয়ার্ডিং লেখা নেই। রিমান্ড চাওয়ার মতো কোনো তথ্য উপাত্ত নেই। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা একজন ব্যক্তি করেন তা ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এটা করবে রাষ্ট্র। তবে এটা কোনো ব্যক্তি করলে সেটা হবে ত্রুটিপূর্ণ।”
এরপর আসামির রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিন প্রার্থনা করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের পাল্টা যুক্তি
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, “তদন্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা অসীম। তদন্ত কর্মকর্তা তদন্তে গিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ দেখতে পেয়েছেন। এজন্য তিনি এই ধারা যোগ করার আবেদন করেন।”
একাধিক উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “তদন্তে যখন যে অপরাধ পাবেন, তখন তিনি সেই অপরাধ বিষয়ে সংযোগ করতে পারেন। একই মামলায় আলাদা আলাদা অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেন।”
বিবাদী পক্ষের আইনজীবীর জবাব
তখন আসামি পক্ষের আইনজীবী তাদের যুক্তি তুলে ধরেন বলেন, “রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করতে হলে অবশ্যই সরকারের অনুমতি লাগবে। এই ব্যক্তিক্রম হলে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে। আসামি একজন বয়স্ক ব্যক্তি। প্রয়োজনে জেলগেট জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।”
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিন রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন।
ঘণ্টাব্যপী মাথা নিচু করে কাঠগড়ায় নূরুল হুদা
শুনানি চলাকালে লোহার রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কে এম নূরুল হুদা। কিছুক্ষণ পর পর বিচারক, পিপি ও তার আইনজীবীর দিকে তাকাচ্ছিলেন। শুনানির পুরো সময়টা তাকে বিমর্ষ দেখা গেছে।