শিরোনাম :
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত নদী রেখে যেতে হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নিলেন অধ্যাপক ড. নাজমুজ্জামান ভূঁই রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনা চ্যাম্পিয়নদের সম্মানে নৈশভোজে ফ্র্যাঙ্কফুর্টার ফায়ার বয়েজ রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া সমাধান কঠিন চাইনিজ তাইপেকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে বাংলাদেশের দুর্দান্ত শুরু দুই মন্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্ব ও আনুগত্য যাচাইয়ের দাবি, আইনি নোটিশ ডাকযোগে ফ্রিজ-মোটরসাইকেলও, দুই মাসে পরিবহন ৪০০ টন পণ্য জন্মের পরই একক ডিজিটাল পরিচয়পত্র, চালু হচ্ছে ‘এক-আইডি’

সম্পাদকীয় : ১৫ আগস্ট ইতিহাসের স্মৃতি মুছে নয়, সত্যকে ধারণ করেই এগোতে হবে

সম্পাদকীয়:
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

সম্পাদকীয়: ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটি। প্রতি বছর এই দিনটি তাই শোক, স্মরণ ও আত্মজিজ্ঞাসার উপলক্ষ হয়ে ফিরে আসে।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে ১৫ আগস্টের স্মৃতি আজ নানা প্রশ্নের মুখোমুখি। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি—যে বাড়ির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায় জড়িয়ে আছে—আজ আর আগের অবস্থায় নেই। একটি জাতির ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে আমাদের collective memory বা সামষ্টিক স্মৃতির জন্য গভীর ক্ষতি।

ইতিহাসের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর শাসনকাল কিংবা তাঁর সরকারের নীতি নিয়ে সমালোচনা করার অধিকারও গণতান্ত্রিক সমাজে সবার রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনো ইতিহাসের স্মৃতিকে নিশ্চিহ্ন করার কারণ হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিণত আচরণ হলো—যে ইতিহাসকে ভালোবাসে, তাকে সম্মান করা এবং যে ইতিহাসের সমালোচনা করতে চায়, তাকেও সেই সুযোগ দেওয়া।

আজ যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেন, তাদের অনেকের কাছেই ৩২ নম্বর একটি আবেগের জায়গা। ১৫ আগস্ট সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো তাদের কাছে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি হতে পারে ব্যক্তিগত শোক, ইতিহাসের প্রতি সম্মান এবং একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতি স্মরণ। সেই শ্রদ্ধা নিবেদনের পথ যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি মানুষের স্মরণ ও শোক প্রকাশের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করবে?

আমরা মনে করি, কোনো সরকারই ইতিহাসের মালিক নয়। সরকার আসে, সরকার যায়; রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে এবং একসময় ক্ষমতা ছাড়ে। কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস থেকে যায়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এ সত্যকে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। একইভাবে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক, সমালোচনা কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক মূল্যায়নও জোর করে বন্ধ করা যায় না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাত থেকে রক্ষা করা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাইলে কেউ যেন বাধার মুখে না পড়েন, আবার কেউ যদি তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করতে চান, তাঁর সেই অধিকারও যেন সুরক্ষিত থাকে। স্মৃতিকে রক্ষা করা মানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং নাগরিকের ইতিহাসচর্চা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। একটি জাতি তার অতীতকে যত ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে পারে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত তত বেশি পরিণত হয়। ধানমন্ডি ৩২-এর মতো ঐতিহাসিক স্থান তাই শুধু একটি ভবন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। ভবনটি আজ আর আগের অবস্থায় না থাকলেও এর ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রাসঙ্গিকতা সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের।

১৫ আগস্টকে ঘিরে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত—রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। হত্যার মাধ্যমে কোনো আদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না; আবার প্রতিহিংসার মাধ্যমে কোনো আদর্শকে মানুষের হৃদয় থেকে প্রতিষ্ঠিতও করা যায় না। ইতিহাসের বিচার শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই করে।

আজ প্রয়োজন বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ইতিহাসকে সত্য, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার আলোকে দেখার সাহস। বঙ্গবন্ধুকে যারা শ্রদ্ধা করেন, তাদের শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার থাকতে হবে। যারা তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেন, তাদেরও যুক্তিসঙ্গত সমালোচনার অধিকার থাকতে হবে। রাষ্ট্রের কাজ কোনো পক্ষের স্মৃতি মুছে দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।

১৫ আগস্ট তাই শুধু শোকের দিন নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির প্রতি একটি কঠিন প্রশ্নও ছুড়ে দেয়: আমরা কি ইতিহাসকে প্রতিহিংসার হাত থেকে মুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে দিতে পারব?

উত্তরটি যদি ইতিবাচক হয়, তবে ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সংরক্ষণ করতে হবে—পছন্দের হোক কিংবা অপছন্দের। কারণ ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না; ইতিহাসকে কেবল বিকৃত করা যায়। আর একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ইতিহাসকে সাহসের সঙ্গে জানা, সংরক্ষণ করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD