বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি না হলে ভবিষ্যতে আবারও ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ফিরে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত যেন কোনোভাবেই ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সঠিক গভর্ন্যান্সের অভাবেই দেশের ব্যাংকিং খাত আজ সংকটের মুখে।
বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক লোকবক্তৃতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
গভর্নর বলেন, দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্র ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং খাত কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, শাসন কাঠামো ও কার্যকর স্বাধীনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সংশোধিত অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্যাংকের সংখ্যা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশে ৬১টি ব্যাংক রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। বাস্তবতা বিবেচনায় ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি জানান, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দুটি রেখে বাকিগুলো একীভূত (মার্জ) করা হবে।
খেলাপি ঋণ নিয়ে গভর্নর আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, আগামী মার্চ মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে তিনি আশা করছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজ্যুলেশন ফান্ড গঠনের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ তহবিলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
গভর্নর আরও বলেন, আর্থিক খাতকে শুধু ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা একটি ভুল ধারণা। বৈশ্বিকভাবে আর্থিক ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে বন্ড মার্কেট, এরপর স্টক মার্কেট, তারপর ব্যাংকিং খাত এবং সর্বশেষ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর। কিন্তু বাংলাদেশে সবচেয়ে অবহেলিত খাত হচ্ছে বন্ড মার্কেট, যা সামগ্রিক আর্থিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনুকূল সরকারি নির্দেশনায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়েছে। ব্যক্তি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানার ভিত্তিতে ব্যাংক পরিচালনার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মডেল অনুসরণ করা জরুরি। ক্যাশলেস ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি খাতকে পুনরুদ্ধারে বর্তমান গভর্নরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন বলেন, ঋণখেলাপির হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমে গেছে, ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতকে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি।