পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী গড়তে হলে এ কাজে নাগরিকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে এবং মহল্লাভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কাজে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক শিক্ষা ও সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা।
গত ১৩ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের আগের দিন নগরবাসীর সচেতনতার লক্ষ্যে ১৫ হাজার ৩১৩ জন নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তা ঝাড়– দিয়ে পরিচ্ছন্নতায় নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আগের রেকর্ডের চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) এই রেকর্ড এখন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষায়।
সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেন, সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। তবে তা টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে এর সাথে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার কোন বিকল্প নেই।
প্রখ্যাত নগরবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকাই মূখ্য। সিটি কর্পোরেশনকে অবশ্যই টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের আরো বেশি গণমুখী হতে হবে। তাদেরকে নগরবাসীর কাছাকাছি যেতে হবে। বেশিরভাগ নগরবাসীই জানেন না, কোন নাগরিক সমস্যা নিয়ে তাদেরকে কোথায় যেতে হবে। অনেকেই তাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসও চিনেন না। নগরবাসীর সাথে সিটি কর্পোরেশনের এই দুরত্ব ঘুচানোর ব্যাপারে কমিশনারদেরই সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, সিটি কর্পোরেশন তাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরদের মাধ্যমে নগরীর বর্জ্য পরিস্কার করবে, তবে এ কাজে যদি নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা যায় তাহলে শুধু পরিচ্ছন্নতাই নয়, যেকোন সমস্যা সমাধান সম্ভব।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, প্রত্যেকটি এলাকার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ওই এলাকার মানুষদের সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিটি মার্কেটের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সিটি কর্পোরেশন তার মার্কেট এলাকার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব দিতে পারে। সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্বও তাদের দিতে পারে। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার সময় পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে একটি বাধ্যতামূলক শর্ত দিতে পারে, যে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনের সড়ক ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখবে। তবেই কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যাবে এবং ঢাকা সত্যিকার অর্থেই একটি পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।
পুরান ঢাকার সুবন্ধন সামাজিক সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, সিটি কর্পোরেশনের যেসব ট্রাক বর্জ্য বহন করে ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যায়, সেগুলোর বেশির ভাগের ত্রিপল নেই। ত্রিপল না থাকায় বর্জ্য নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার সময় দুর্গন্ধের পাশাপাশি ট্রাক থেকে বর্জ্য ও ময়লা পানি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ময়লা আর পরিষ্কার হয় না। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব বর্জ্যরে কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, মহল্লাভিত্তিক সামজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে যদি সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলররা আলোচনা করে এবং তাদের নিজ নিজ এলাকার নাগরিকদের সচেতনতার দায়িত্ব দেয় তাহলেই পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন বাসসকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ঘিঞ্জি ও ঘণবসতি এলাকা বেশি এবং এখানে রাজধানীর অন্য এলাকার চেয়ে নি¤œ আয়ের মানুষের বাস বেশি। এখানকার মানুষের কালচার ও অভ্যাসগত কিছু বিষয় রয়েছে। এই তিনটি কারণে এই এখানকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটু কঠিন। তাই এখানকার মানুষদের সচেতন করে তোলাও একটু কঠিন।
তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মনিটরিং করতে সিটি কর্পোরেশন প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। এদের তত্ত্বাবধানে এলাকাভিত্তিক বর্জ্যগুলো সংগ্রহ করে ল্যান্ডফিল্ডে পাঠানো হচ্ছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়টি হচ্ছে নগরবাসীকে সচেতনতা করা। সিটি কর্পোরেশন এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজ হবে এবং ঢাকা নগরী সত্যিকার অর্থেই একটি পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে পরিচিতি পাবে।