শিরোনাম :
ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে দ্রুত বিধিমালা: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আছে, মুসলিম বিশ্বের জন্যও অবদান রাখতে চাই : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’: রাষ্ট্রপতি সাগর-রুনি হত্যায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের যোগসূত্রের কুলু পেয়েছি: চিফ প্রসিকিউটর লর্ডসে পাকিস্তানকে ১৯৪ রানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ইংল্যান্ডের সিরিজ জয় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ: সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিনকে দুদকের তলব বিদেশে উচ্চশিক্ষার ভিসা সহজ করতে মন্ত্রিপরিষদে বিশেষ কমিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্রের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পুরস্কার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশকেকে সিএমজির চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রদর্শন

‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’: রাষ্ট্রপতি

জার্মান-বাংলা ডেস্ক, ঢাকা অফিস:
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের বিচারের আওতায় এনে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।

রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন অসংখ্য স্ত্রী রয়েছেন, যারা প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন। এমন সন্তানও রয়েছে, যাদের শৈশব কেটেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়; কিন্তু সেই বাবা আর কখনো সন্তানকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য ফিরে আসেননি।

গুমকে সাধারণ কোনো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। একটি মানুষকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করার সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবার থেকেও কেড়ে নেওয়া হয় শান্তি, স্বাভাবিক জীবন, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু গুম ও হত্যার মাধ্যমে একজন নাগরিকের একাধিক মৌলিক অধিকার একই সঙ্গে লঙ্ঘিত হয়।

বিগত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই সময়ে গুম এবং গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ বাংলাদেশের ওপর ভয়াবহতার মতো চেপে বসেছিল। ভিন্নমত প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অপরাধের বিষয় অস্বীকার করে গেছে।

রাষ্ট্রপতি বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ গুমের শিকার অসংখ্য ব্যক্তির কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এসব নিখোঁজ মানুষের পরিবারের সদস্যদের জীবনের প্রতিটি রাত এখনো বেদনা, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে কাটছে।

এ সময় আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূ এবং সাধারণ নাগরিকের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের অনেককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এবং আলো-বাতাসহীন ‘আয়নাঘরে’ বন্দি রাখা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে ফিরে এলেও এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাক্স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, স্বাধীনতার পর গুম-খুনের সংস্কৃতি সেই আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম, খুন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া সব সময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি। রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পক্ষের অনেকেই গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন প্রতিশোধের পরিবর্তে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানান তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার উদ্দেশ্যে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব বর্বর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, সামনে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Victims first, Action now’। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং গুমের ঘটনাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো যে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করে আসছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা এবং পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয়ের পরিবেশ থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং সেই দেশের নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন—সেটিই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।” কোনো মাকে সন্তানের জন্য এবং কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য আর চোখের পানি ফেলতে হবে না বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথাও ঘোষণা করেন তিনি।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানোকে রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা, সুশাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি করা, জবাবদিহি ও বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ইনসাফকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি। গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।

সূত্র: রাষ্ট্রপতির বক্তব্য; আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠান

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

©germanbanglanews24
Developer Design Host BD