গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘Agreement on Reciprocal Trade (ART)’ নামক একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের আজকের সমাবেশ ও মিছিল থেকে সরকারের প্রতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানানো হয়,এই চুক্তি বাতিল না হলে তীব্র গণআন্দোলন অনিবার্য। ১৭ মে বিকেল ৪:৩০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বাসদের সাধারণ সম্পাদক ও জোটের শীর্ষ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের নেতৃবৃন্দ কমরেড শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, মাসুদ রানা, নাসিরুদ্দিন আহমেদ নাসু ও ডা. মুশতাক হোসেন বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা বলেন, একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখতিয়ার কেবল রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সীমা লঙ্ঘন করে দেশবাসীকে না জানিয়ে এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যার মেয়াদ আগামী ১৫ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই চুক্তিটি মোট ১৭৭ পৃষ্ঠার, কিন্তু মার্কিন পক্ষ মাত্র ৩২ পৃষ্ঠা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। আর বাংলাদেশ সরকারতো দেশবাসীকে জানানোর প্রয়োজনই বোধ করছেনা। সেই ৩২ পৃষ্ঠার মধ্যেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অসংখ্য অসম শর্ত প্রকাশিত হয়েছে। বাকি ১৪৫ পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে তা বাংলাদেশের জনগণ তো দূরের কথা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও প্রকাশ করেনি। এই গোপনীয়তা একটি বিপজ্জনক সংকেত। আগামী ১৫ বছরে আন্তর্জাতিক বাজার দরের চেয়ে বেশি দামে কমপক্ষে ১,৫০০ কোটি ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে বাধ্য থাকবে বাংলাদেশ। প্রতি টনে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ৭৫ ডলার বা ৯০০০/- টাকা বেশি মূল্যে আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছর ৭ লাখ টন গম বাধ্যতামূলকভাবে কিনতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য আমদানি করতে হবে, যার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১২৫ কোটি ডলার। তুলা, ফলমূল ও কৃষিপণ্য বাজারদরের বাইরে ৩৫০ কোটি ডলার বা ৪২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মার্কিন বেসামরিক কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিনা দরপত্রে ৪৫ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি ইতিমধ্যে গত ৩০ এপ্রিল করে ফেলেছে। যা সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় পাবে; বিপরীতে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে — যার অধিকাংশই রফতানির সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। গত বছর মার্কিন পণ্য থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে ১,২০০ কোটি টাকার শুল্ক। চুক্তি কার্যকর হলে মাত্র ১০ কোটি টাকা আদায় হবে; হারাতে হবে ১,১৯০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বিধ্বংসী দিকটি হলো: চুক্তিতে মাছ, মাংস, মুরগি, দুধসহ সব কৃষিপণ্যের অবাধ আমদানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের পোলট্রি, মৎস্য, ডেয়ারি ও দুগ্ধ খাতে কর্মরত কোটি মানুষের জীবিকা ধ্বংসের মুখে পড়বে। তৈরি পোশাক শিল্পও বিপন্ন হবে মার্কিন তুলা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা পরিবহন খরচ বাড়াবে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
চুক্তির শর্তানুযায়ী, মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থের পরিপন্থী কোনো দেশ—অর্থাৎ চীন, রাশিয়া—এর সাথে বাংলাদেশ কোনো বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনতে মার্কিন ‘ছাড়পত্র’ চাইতে হচ্ছে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এটি অপমানজনক।
সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়েও নির্ভরশীলতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ৮০% প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম চীন থেকে আনে। এই চুক্তি বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক শিবিরে ঠেলে দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে, চীন তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং এই অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে টেনে নেওয়ার যে প্রচেষ্টা এই চুক্তিতে দৃশ্যমান, তা বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক সংঘাতের ঘূর্ণিপাকে ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান—যিনি এই চুক্তি স্বাক্ষরে সবচেয়ে তৎপর ছিলেন—দাবি করেছেন যে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করেই এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এই দাবি একটি গুরুতর রাজনৈতিক প্রতারণা। জামায়াতে ইসলামি এই দাবি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছে। কিন্তু সংসদ চলার দীর্ঘ সময়েও জামায়াতের পক্ষ থেকে এই চুক্তি নিয়ে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি, কোনো আলোচনা তোলা হয়নি। এতে প্রমাণ হয় জামায়াত নির্লজ্জ মিথ্যাচার করছে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পয়েন্ট অব অর্ডারে এই চুক্তি সংসদে আলোচনায় তুলতে চাইলে স্পিকার তা ‘বিধিবহির্ভূত’ বলে আটকে দিয়েছেন। কোন বিধির আওতায় জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি চুক্তির আলোচনা বন্ধ রাখা যায়? আসন্ন সংসদ অধিবেশনেও যদি জামায়াতের পক্ষ থেকে এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে জনগণ বুঝবে তারা মিথ্যাচার করছে। সাম্রাজ্যাবাদী আমেরিকার সাথে আঁতাত করেই তাঁরা চলছে। বিএনপি সরকার খলিলুর রহমানকে পুরস্কৃত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে। আর বলছে চুক্তিতে তাদের ‘সম্মতি’ ছিল। তাহলে এই সরকার কি জনগণের সরকার, নাকি মার্কিন স্বার্থের সরকার?
গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে: ট্রাম্প প্রশাসন যে International Emergency Economic Powers Act (IEEPA)-এর আওতায় শুল্ক আরোপ করেছিল, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছেন, IEEPA রাষ্ট্রপতিকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। শুল্ক আরোপের এই ক্ষমতা মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কেবল কংগ্রেসের।
এই ART চুক্তির ভিত্তিই ছিল সেই IEEPA-ভিত্তিক শুল্ক হুমকি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই ভিত্তি ধসে পড়েছে। মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে একই ধরনের চুক্তি ‘বাতিল ও অকার্যকর’ ঘোষণা করেছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী Johari Abdul Ghani স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: ‘It is not on hold. It is no longer there, it’s null and void.’
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট চুক্তির অনুসমর্থন স্থগিত রেখেছে। ভারত আলোচনা স্থগিত করেছে। প্রশ্ন একটাই—মালয়েশিয়া পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে অসম চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। অন্যথায় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার হুশিয়ারী প্রদান করেন।