অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য চাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরার তালায় দৈনিক কালের কণ্ঠের উপজেলা প্রতিনিধি রোকনুজ্জামান টিপুকে ১০ দিনের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. রাসেল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ দণ্ডাদেশ ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
অভিযোগ উঠেছে, ৯ কোটি টাকার তালা উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। জানা গেছে, এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সাংবাদিক রোকনুজ্জামান টিপু পজেলা পরিষদে যান।
এ সময় তালা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, (এলজিইডি) তালার উপ-সহকারি প্রকৌশলী এম এম মামুন আলম তথ্য দিতে অস্বীকার করায় সাংবাদিকের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিককে ‘তথ্য জানার কে’- প্রশ্ন করলে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এরপর উভয়পক্ষ ঘটনাটি তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি সরেজমিনে উপস্থিত শ্রমিকসহ স্থানীয়দের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের রায় দেন।
তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ রায়কে ‘সাজানো নাটক’ বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম। এ ব্যাপারে জোরালো প্রশ্ন উত্থাপন করে সংগঠনটি বলেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতস্থলে যারা ছিলেন তারা কি কেউ নিরপেক্ষ?
মামলার সঙ্গে জড়িত সবাই তো ঠিকাদারের শ্রমিক এবং প্রশাসনের লোক। প্রশাসনের উচিত ছিল ঘটনার নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তারা তা না করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের দূরত্বের ঝাল মিটিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
এ ঘটনায় তালা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম এম হাকিম, সাধারণ সম্পাদক জোয়ার্দ্দার ফারুক হোসেনসহ উপজেলায় কর্তব্যরত সাংবাদিকরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তালা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম এম হাকিম বলেন, ‘এ ধরনের সাজা দেয়ার ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ। দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে প্রতিবেদন তৈরির জন্য সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে যাবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁকে উল্টো কেনো সাজা দেয়া হবে?’
একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জোয়ার্দ্দার ফারুক হোসেন বলেন, ‘কর্মরত সব সাংবাদিক এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।’
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কারাদণ্ডাদেশ দেয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ইউএনও এবং উপজেলা প্রকৌশলী তথ্য অধিকার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন সংগঠনটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর।
তিনি বলেন, ‘সাংবাদিককে কারাদণ্ড দিয়ে তাঁরা দুর্নীতি ও অনিয়মকে উসকে দিয়েছেন; যা দেশের জন্য একটি অশুভ ইঙ্গিত।’
এ ঘটনার প্রতিবাদে তালায় বুধবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম।
দণ্ডপ্রাপ্ত সাংবাদিকসহ তালার সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেছেন, দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় কালের কণ্ঠের সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে এই সাজা প্রদান করা হয়েছে। তাই তাঁরা প্রতিবাদ করবেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিক রোকনুজ্জামান টিপু বলেন, ‘কাজের মান খারাপ হচ্ছে, কাদা মেশানো খোয়া দেয়া হচ্ছে, সিমেন্ট কম দেয়া হচ্ছে- এমন খবরের ভিত্তিতে আমি সেখানে তথ্য সংগ্রহ করতে যাই। এ সময় উপ-সহকারী প্রকৌশলী এম এম মামুন আলম আমাকে কোনো সহযোগিতা না করে বলেন, “তুই জানার কে?” এরপর ছাতা দিয়ে মারতে শুরু করেন। আমি তাঁকে প্রতিরোধ করতে গেলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।’
তালা উপজেলা প্রকৌশলী রথিন্দ্রনাথ হালদার বলেন, ‘এ সময় আমি অফিসের কাজে বাইরে ছিলাম। অফিসে ফিরে শুনি আমার অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে মারপিট করা হয়েছে।’
ইউএনও শেখ মো. রাসেল বলেন, ‘একজন সাংবাদিক আমার একজন কর্মকর্তাকে মারধর করেছে- এমন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত শ্রমিকদের সাক্ষ্যগ্রহণ করে ঘটনার সত্যতা পাই। এ জন্য অভিযুক্তকে ১৭৬ ধারায় ১০ দিনের সাজা প্রদান করা হয়েছে।’