জার্মানির ঐতিহাসিক শহর হাইডেলবার্গের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব অথচ জীবন্ত প্রতীক- ডিয়েনস্টম্যান মুক। ব্রোঞ্জে গড়া এই মূর্তিটি শহরের শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার বহি:প্রকাশ।
ডিয়েনস্টম্যান মুক ছিলেন কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন, তিনি ছিলেন এক বাস্তব মানুষ। তাঁর নাম ইওহানেস ফ্রিস। জন্ম ১৮৩৭ সালে, মৃত্যু ১৯০৫ সালে। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি কাজ করতেন রেলস্টেশনে একজন ডিয়েনস্টম্যান হিসেবে। জার্মান ভাষায় ‘ডিন্স্টমান’ বলতে বোঝায় এমন একজন কর্মী, যিনি যাত্রীদের লাগেজ বহনে সহায়তা করেন।

স্টেশনে তিনি পরিচিত ছিলেন নম্বর তেহাত্তর নামে। বিনয়ী, পরিশ্রমী ও হাসিখুশি স্বভাবের এই মানুষটি জীবনের শেষদিকে দারিদ্র্যের মধ্যেও ছিলেন সবার প্রিয়। মৃত্যুর বহু বছর পরও শহরবাসী তাঁকে ভুলতে পারেনি।
২০০১ সালের ৯ জুন হাইডেলবার্গের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের সামনে স্থাপন করা হয় তাঁর স্মৃতিবাহী এই মূর্তি। শিল্পী আরমিন গ্যুথার নির্মাণ করেন ব্রোঞ্জের এই জীবনঘনিষ্ঠ ভাস্কর্যটি। মূর্তিটি উপহার দেওয়া হয় জার্মান রেল কর্তৃপক্ষকে—ডয়চে বান নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানকে। শিল্পী এটি উৎসর্গ করেন তাঁর দুই পুত্র আন্দ্রেয়াস ও স্টেফানকে, যেন পরবর্তী প্রজন্ম বুঝতে পারে, শ্রম ও মানবতার মর্যাদা কখনও ম্লান হয় না।
মূর্তিটির গায়ে দেখা যায় পুরনো ইউনিফর্ম, বুকে খোদাই করা স্পষ্ট নম্বর “৭৩”। পাশে রাখা একটি সুটকেস—যেন এখনো কোনো যাত্রী ডেকে উঠলেই তিনি সহায়তায় এগিয়ে যাবেন। মূর্তিটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে, রেলস্টেশনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এই নীরব অথচ বলিষ্ঠ উপস্থিতি। এটি যেন নিঃশব্দে বলে যায়, শ্রমই সৌন্দর্য, বিনয়ই মহিমা।
ডিয়েনস্টম্যান মুক আজ হাইডেলবার্গ শহরের মানবিক আত্মার প্রতীক। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সেই অগণিত সাধারণ মানুষকে, যাদের ঘাম ও হাসিতে গড়ে ওঠে এক শহরের জীবন। তিনি ধনী বা বিখ্যাত ছিলেন না, তবু মানবতার আলোয় অমর হয়ে আছেন।
প্রতিদিন শহরবাসী ও পর্যটকেরা এই মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, শিশুরা তাঁর ব্যাগে হাত রাখে। যেন তিনি এখনো জীবিত রেলস্টেশনের প্রতিটি সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর নীরব হাসি ভেসে আসে। এই মূর্তিটি শুধু এক শ্রমজীবী মানুষের নয়, বরং এক শহরের হৃদয়ের উষ্ণ মানবিকতার প্রতীক।