বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসির রেকর্ডযাত্রা যেন থামছেই না। প্রতিটি ম্যাচেই নতুন কোনো কীর্তি গড়ে ফুটবল ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শুরুতে একাদশে না থাকলেও বদলি হিসেবে নেমে দৃষ্টিনন্দন ফ্রি-কিক থেকে গোল করে টানা সাত বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েছেন এই মহাতারকা।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি দেখতে উপস্থিত ছিলেন ৭০ হাজার ৬৪৯ দর্শক। ম্যাচের আগে থেকেই জানা ছিল, মেসিকে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে এবং তিনি শুরু থেকে খেলবেন না। তবু তাকে একঝলক দেখার আশায় দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে গ্যালারি।
ম্যাচের ৩১ মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। প্রথমে জিওভানি লো সেলসো গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এরপর লাউতারো মার্টিনেজ পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। বিশ্বকাপে দুজনেরই এটি ছিল প্রথম গোল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জর্ডানও ইতিহাস গড়ে। ৫৫ মিনিটে মাউসা আল-তামারি গোল করে ব্যবধান কমান এবং বিশ্বকাপে জর্ডানের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক স্পর্শ করেন। তবে ম্যাচের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত তখনও বাকি ছিল।
বেঞ্চে বসে থাকা মেসিকে টেলিভিশনের ক্যামেরা বারবার দেখাচ্ছিল। প্রতিবারই দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠছিল স্টেডিয়াম। অবশেষে ৬০ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। অধিনায়ক নিকোলাস ওতামেন্দি নিজের আর্মব্যান্ড খুলে মেসির হাতে তুলে দেন। এরপরই যেন ম্যাচের আবহ পুরোপুরি বদলে যায়।
মাঠে নামার পর আক্রমণে গতি বাড়ান মেসি। কয়েকবার প্রতিপক্ষের ফাউলের শিকার হওয়ার পর ৮০ মিনিটে একটি অসাধারণ ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন তিনি। জর্ডানের রক্ষণভাগের দেওয়াল ভেদ করে তার বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে গেলে মুহূর্তেই আনন্দে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। গোল উদ্যাপনে শূন্যে ভেসে ওঠা মেসির ছবি শত শত ক্যামেরায় বন্দি হয়।
এর আগে ২২ জুন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে উন্নীত করেছিলেন মেসি। জর্ডানের বিপক্ষে গোল করে সেই রেকর্ডকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি টানা সাত বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার নতুন বিশ্বরেকর্ডও নিজের করে নেন। চলতি আসরের গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়—প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং তৃতীয় ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে একটি গোল।
মেসির এই ধারাবাহিকতার শুরু অবশ্য ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ থেকেই। সেবার নকআউট পর্বে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি করে এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে দুটি গোল করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতাই ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে আরও দীর্ঘ হয়েছে।
এর আগে বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার রেকর্ড ছিল ফ্রান্সের জ্যুস্ত ফঁতেন ও ব্রাজিলের জাইরজিনহোর দখলে। ১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে প্রথমে ফঁতেন এবং ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে জাইরজিনহো এই কীর্তি গড়েছিলেন। দীর্ঘদিন অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড ভেঙে এখন এককভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন মেসি।
এদিকে ৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপে ১২ গ্রুপের লড়াই শেষে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও মেক্সিকো গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই জিতে নকআউট নিশ্চিত করেছে। ‘জে’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ষোলোয় উঠেছে আর্জেন্টিনা। একই গ্রুপ থেকে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়াও পরবর্তী পর্বে জায়গা করে নিয়েছে।