শিরোনাম :
টেকসই প্রবৃদ্ধিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতার নতুন দিকনির্দেশনা ২৮তম শাংহাই চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নামল রেলওয়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন, পাঁচ বছরে ২৪ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য পেনাল্টি মিসের হতাশা ভুলে ইতিহাস গড়লেন মেসি, অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে অভিযোগ: ঢাবির তিন শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত, আরও দুজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে সুরের মিলনমেলা, দুই দিনের আয়োজন শেষ করল সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ ফ্রান্সে রেকর্ড দাবদাহে দুই দিনে প্রাণ গেল ১৮ জনের নতুন এল নিনোর প্রভাবে বিপর্যয়ের আশঙ্কা, উষ্ণ হতে পারে ২০২৭ সাল সাড়ে তিন মাস পর হরমুজ প্রণালি পেরোল ‘বাংলার জয়যাত্রা’ বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় জয়, নকআউট নিশ্চিত করল নরওয়ে

কাহ্ন জাতিস্মর: “কবিতা মানে ভয় না পাওয়া, কবিতা মানে মুক্তি”

ফাতেমা রহমান রুমা,জার্মানি:
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৫

কবি, আবৃত্তিকার, শিশু-কিশোর সংগঠক,সাংবাদিক, সাংস্কৃতিকর্মী কাহ্ন জাতিস্মর সাম্প্রতিক সময়ে শুধু সাহিত্য নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়েও সরব হয়েছেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির দায়, দারিদ্র্যের উল্লম্ফন, ম্যক্তিযুদ্ধ স্মারক সহ দেশের সকল ভাস্কর্য ধ্বংস, ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তির উত্থান, মব সন্ত্রাস, সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চাওয়া থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীদের তোষামোদি অথবা নীরবতা এসব বিষয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন। তাঁর সঙ্গে জার্মান বাংলা চ্যানেলের জন্য কথা বলেছেন চ্যানেলটির সম্পাদক ফাতেমা রহমান রুমা।

 

রুমা: কাহ্নদা, কবিতা আপনার কাছে কী?

কাহ্ন জাতিস্মর:কবিতার কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত নেই। কবিতা এক ধরণের শব্দস্বাদ, আমার কাছে কবির মূর্ত-বিমূর্ত ভাবনার নান্দনিক অনুবাদ, যাকে চিত্রকল্পে, ছন্দে-বিছন্দে, থরে-বিথরে নানা স্বাদের শিল্পরসে ভিজিয়ে তুলে ভাব ও বোধকে এক নান্দনিক রূপ-সৌন্দর্য দেয়া। শব্দের শৈল্পিক শিহরণই কবিতা। কবিতা এমন এক শিল্প যেখানে শব্দ শুধু কথা বলে না, বরং ছবি আঁকে, সুর তোলে, আবেগের দোলা সৃষ্টি করে। তাই বলে কবিতা শুধুই বিনোদন, এটা আমি মানি না।

কবিতাও সময়ের আয়না। সময়ের সেই আয়না যেখানে আমরা শুধু নিজের মুখ দেখি না, দেখি সমাজ, পরিবেশ তথা জীবনের গভীর প্রতিচ্ছবিও। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন সাহিত্যের উদ্দেশ্য কেবল আনন্দ দেওয়া নয়। সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দ থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের আসল কাজ হলো পাঠককে জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা, তাকে গভীরতর অর্থ উপলব্ধি করানো। তাই নাটক যদি কেবল হাসায় তবে তা অসম্পূর্ণ, সঙ্গীত যদি কেবল মধুর শোনায় তবে তা অপূর্ণ। সাহিত্য মানুষের ভেতরে প্রশ্ন তোলে আমি কে, আমার চারপাশে কী ঘটছে, আমি কীভাবে বাঁচব।

রুমা: তাহলে সাহিত্য কি সামাজিক দায়ও তৈরি করে?

কাহ্ন জাতিস্মর: অবশ্যই। সাহিত্য শুধু সৌন্দর্য নয়, দায়বদ্ধতাও তৈরি করে। নজরুল ইসলামকে দেখেন, তিনি ছিলেন প্রেমের কবি, অভিমানের কবি, সাম্যবাদের কবি কিন্তু তার চেয়েও বড় বা খ্যাত হয়ে উঠলেন বিদ্রোহী কবি হিসেবে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তাঁর কণ্ঠে গর্জে উঠেছিল এদেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল। শিকল পরা ছল মোদের, এই শিকল পরা ছল। এটা নিছক কবিতা নয়, বরং ছিল মুক্তির মন্ত্র। নজরুল দেখিয়েছেন সাহিত্য মানে শুধু রূপকল্প নয়, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

 

রুমা: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হলো, ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুর হলো, নাটক সঙ্গীত বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। বিষয়গুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?

কাহ্ন জাতিস্মর:এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাষ্ট্র যখন ভয় পায় তখন প্রথম আঘাত আসে সংস্কৃতির ওপর। নাটক প্রশ্ন তোলে, গান সাহস শেখায়, ভাস্কর্য স্মৃতি মনে করায়। তাই শাসকেরা ভাস্কর্যের দিকে যায়, কারণ তারা জানে যদি ইতিহাস টিকে থাকে তবে তাদের মিথ্যা টিকবে না। বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায়নি। আজও তাঁর স্মৃতিকে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে।

রুমা: রিপোর্ট বলছে ২০০০ সালে দারিদ্র্য ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই পরিসংখ্যান ছিল ১৮.৭ শতাংশে। অথচ এখন আবার বেড়ে প্রায় ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আপনার কাছে এর মানে কী?

কাহ্ন জাতিস্মর: এটা শুধু সংখ্যা নয়, এটা প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের হাঁড়িভাঙা কান্না। বাংলাদেশ দুই দশক ধরে দারিদ্র্য কমিয়েছে। ২০০০ সালে দারিদ্র্য ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে নেমেছিল ১৮.৭ শতাংশে। অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ২৭.৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কারণ অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, ব্যাংক থেকে দেদারসে টাকা লোপাট হচ্ছে, হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। ২৯ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে তার মধ্যে ১৮ লাখ নারী অথচ সরকার ব্যস্ত থাকছে ইতিহাসে রিসেট বাটন নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ধুলিস্যাৎ করতে, দেশের সকল ভাস্কর্য ধ্বংসের নাটক আর সংবিধান পাশ কাটিয়ে জুলাই সনদ নামে এক ছদ্মবেশি, মেটিকুলাসলি ডিজাইন্ড কথিত প্রতারণার বিপ্লবের রোয়া চাপিয়ে দিতে।

রুমা: ছাত্ররাজনীতি আজ প্রায় মব সন্ত্রাসে পরিণত। তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করার এই প্রবণতা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

কাহ্ন জাতিস্মর: এটা আসলে প্রজন্ম হত্যা। একসময় ছাত্ররা ছিল মুক্তিযুদ্ধের মশাল। আজ তারা শাসকের লাঠিয়াল বাহিনী। ইতিহাস বলে এক মব আরেক মবকে জন্ম দেয়। আজকের মব দমন করবে কাল আরও ভয়ঙ্কর মব এসে। নাইজেরিয়ার মতো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গ্যাং এর চিত্র আমাদের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশ যদি এই পথে হাঁটে, মানুষ নিজের দেশেই রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে।

রুমা: একজন লেখকের সামাজিক দায় কোথায়?

কাহ্ন জাতিস্মর:লেখকের প্রথম দায় হলো সত্য বলা। ফুল পাতার কবিতা লিখলেও চারপাশের কান্না এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিপীড়িতের কণ্ঠস্বর হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে উচ্চারণ করা, এই হলো লেখকের দায়িত্ব। লেখক যদি নীরব থাকে তবে সমাজ আরও অন্ধকারে ডুবে যাবে।

রুমা: সংবিধানের উপর জুলাই সনদ চাপিয়ে দেওয়া, আন্তর্জাতিক লবির প্রভাব এসব নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

কাহ্ন জাতিস্মর: সংবিধান কেবল একটি দলিল নয়, এটি একটি জাতির সর্বোচ্চ আইন বা প্রাণ।এই সংবিধান ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তে আর আড়াই লক্ষ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধান অথচ আজ সেই সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে জুলাই সনদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকারের নামান্তর। এর পেছনে আন্তর্জাতিক লবি, করপোরেট শক্তি এবং দেশের ভেতরের দালালচক্র সক্রিয়। তারা বাংলাদেশকে গণতন্ত্রহীন এক পরীক্ষাগারে পরিণত করতে চায়।

রুমা: তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা নিয়েও অনেক সমালোচনা আছে।

কাহ্ন জাতিস্মর:এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। যে সময়ে কলম জ্বলে ওঠার কথা সেই সময়ে অনেকে চুপ। নীরবতা মানে সহায়তা, শাসকের পক্ষে অন্যায়ের পক্ষে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং অন্যায়েরই সুবিধা বাড়ায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই নীরবতাকে ক্ষমা করবে না।

রুমা: সবশেষে পাঠক ও তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?

কাহ্ন জাতিস্মর:আমার বার্তা একটাই, শিল্পই আমাদের শেষ আশ্রয়। ভাস্কর্য ভাঙলে আমরা আবার ভাস্কর্য গড়ব। নাটক বন্ধ হলে আমরা রাস্তায় নাটক করব। গান দমন হলে আমরা আকাশ ভরাব গান দিয়ে। কবিতা মানে ভয় না পাওয়া। কবিতা মানে মুক্তি, মুক্তি মনের, মুক্তি বিবেকের, মুক্তি মানুষের সম্ভাবনার। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, দালাল বা বিদেশি লবির দান নয়। তাই আমাদের শপথ, এই দেশকে কোনোভাবেই দালালের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।

রুমা: ধন্যবাদ কাহ্নদা। আপনার উত্তরগুলো কেবল সাক্ষাৎকার নয়, এটি যেন এক নতুন শপথ।

কাহ্ন জাতিস্মর: ধন্যবাদ আপনাকেও রুমা। ধন্যবাদ জার্মান বাংলা চ্যানেলের সকলকে।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD