শিরোনাম :
ইসলামাবাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বিশ্ব স্থিতিশীলতায় সমন্বয় জোরদার করছে বেইজিং ও মস্কো খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে সমবায় ব্যবস্থার বড় ভূমিকা নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করল ইউএন উইমেন সকালের পদচারণায় পাঁচটা পি-মন্ত্র এই সরকার মহাকাশ প্রযুক্তিকে বিলাসিতা হিসেবে নেয়নি : ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এবারের বাজেট হবে মানবিক বাংলাদেশ গড়ার বাজেট : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী উন্নয়ন করতে হবে সবাইকে একসাথে :ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন জবাবদিহিতামূলক এলিট ফোর্স গঠনে নতুন আইন প্রণয়ন হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় ও উর্বর ক্ষেত্র বাংলাদেশ: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

ইসলামাবাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক

দেলওয়ার জাহিদ বিপ্লব, ফ্রাঙ্কফুট,জার্মানি:
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

অন্তবর্তী সরকারের পথেই বর্তমান সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে মরিয়া। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তির সঙ্গে প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বন্ধুত্বে বাড়তি উৎসাহ দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে মনে করছেন অনেকেই। মনে রাখতে হবে একাত্তরের গণহত্যার জন্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি ইসলামাবাদ। বরং বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে, পাকিস্তানি সেনা এখনও একাত্তরের বদলা নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বাংলাদেশের মাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নিজেদের পরাজয় তারা মেনে নিতে পারছে না। তাই পাকিস্তানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা পাকিস্তানি বায়ু সেনার শীর্ষকর্তাদের ঢাকা সফর নিয়ে অনেকেই আতঙ্কিত।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি হঠাৎ করেই বাংলাদেশ সফর করেন। ঢাকায় পাকিস্তানি দূতাবাসের জরুরি বার্তা পেয়ে পাকিস্তানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ও ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন। ঢাকা সফররত পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমে সাক্ষাত করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও সাক্ষাৎ করেন নাকভির সঙ্গে। শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎই নয়, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্মারকের মূল বিষয় হচ্ছে মাদক চোরাচালান ও মানবপাচার রোধ এবং সীমান্ত সুরক্ষা। অথচ দুই দেশের মধ্যে কোনও ভৌগলিক সীমান্ত নেই। এমনকী, মাদক বা মানব পাচার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে কোন সমস্যা নেই। কূটনৈতিক মহলের অনুমান, উভয় দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোপন কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ক্রিকেটকে উপলক্ষ্য করে নাকভির এই ঢাকা সফর বেশ রহস্যজনক। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সফরকালে নাকভি নিজের পাকিস্তানি সশস্ত্র দেহরক্ষীদের নিরাপত্তা বলয়ে ছিলেন। বাংলাদেশি নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর ভরসা রাখতে পারেননি তিনি। এটা একটি স্বাধীন দেশের পক্ষে যথেষ্ট অপমানজনক।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভির এই ঢাকা সফর শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আফগানিস্তান সীমান্তের নাস্তানাবুদ ইসলমাবাদ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আর্থিক দিক থেকে অতি দুর্বল পাকিস্তান বাংলাদেশের কাঁধে ভর দিয়ে চীনের কাছ থেকে আরও সুবিধা আদায় করতে চায়। সেই লক্ষ্যেই শিগগিরই ঢাকা সফরে আসতে পারেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সৌদি আরবের জেদ্দায় ফিলিস্তিনবিষয়ক ওআইসি নির্বাহী কমিটির বৈঠকের ফাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এমনটিই জানিয়েছেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার। শোনা যাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও ইসলামাবাদ সফরে যেতে পারেন।

পাকিস্তান এখন বাংলাদেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। জামায়াতে ইসলামীর হাতের পুতুল অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই চলছে ইসলামাবাদের গভীর ষড়যন্ত্র। বর্তমান সরকারের আমলেও সেই ষড়যন্ত্রে লাগাম টানার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিএনপি দলটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করলেও পাকিস্তানি ফাঁদে তারা পা দিতে চলেছে বলে অনেকের আশঙ্কা।

সেই আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করতেই ১১ মে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। পাকিস্তানের মাটিতে ভারতীয় বায়ু সেনার জঙ্গি বিরোধী অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বর্ষপূর্তি হচ্ছে ১১ মে। সেদিনই তাদের ঢাকা সফর বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ইসলামাবাদ বায়ুসেনার স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল ঔরঙ্গজ়েব অহমেদ। জানা গিয়েছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পাইলট এবং কারিগরি কর্মকর্তাদের (টেকনিক্যাল স্টাফ) পাকিস্তানে পাঠাবে সরকার। সেখানে অত্যাধুনিক লড়াকু জেট ওড়ানো, মাঝ-আকাশের কসরত ও লড়াই এবং সামরিক বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নেবেন তারা। পাকিস্তানের সঙ্গে এধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া কতোটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি নেওয়া শুরু হয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামল থেকে। তার সময়ে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাইয়ে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিঁধুর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেন বাংলাদেশ বায়ুসেনার প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান। সেখানেই ঠিক হয় পাকিস্তান বায়ুসেনার কাছ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি নেবে।

এমনকী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমান কেনারও পরিকল্পান করে। এই যুদ্ধবিমানটির মূল নকশা তৈরি করেছে চীন। হালকা ওজনের যুদ্ধবিমানটি বেজিঙের ‘চেংডু এয়ারক্রাফ্‌ট কর্পোরেশন’ বা সিএসি তৈরি করে। তবে চীনা প্রযুক্তিতে বর্তমানে ইসলামাবাদও এই যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করছে। ‘পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেস’ (পিএসি) বর্তমানে এই যুদ্ধজাহাজের ৫৮ শতাংশ এবং চীন বাকি ৪২ শতাংশ তৈরি করছে। কিন্তু বিমানটির কারিগরি দক্ষতা মোটেই সন্তোষজনক নয়। প্রতিবেশী ভারত যেখানে ফ্রান্স থেকে রাফালের মতো যুদ্ধ বিমান কিনছে সেখানে চীনা প্রযুক্তিতে পাকিস্তানি এই যুদ্ধ বিমান দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কতোটা মজবুত করতে সেটা যথেষ্টই প্রশ্নবোধক।

তাছাড়া পাকিস্তানি বায়ুসেনা মোটেই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিজ্ঞানে পারদর্শী নয়। তাদের প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষে কতোটা লাভজনক হবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানের সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে সমঝোতায় অবশ্যই ঝুঁকি রয়েছে। এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্তাদেরও প্রশিক্ষণের জন্য লাহোরে পাঠানো হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই ইসলামাবাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ছে। নতুন করে শুরু হয়েছে উভয় দেশের মধ্যে যাতায়াত। বিমান চলছে দুই দেশের মধ্যে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বদলে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতী ইসলামী, হিজবুত তাহরীর সহ আরো একাধিক মৌলবাদী সংগঠনের নেতাদের পাকিস্তান সফর বেড়ে গিয়েছে। তারা গিয়ে সে দেশের মৌলবাদীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। আর পাকিস্তান থেকে উড়ে এসে লস্করই তৈয়বা, জইস্ই মহম্মদ, তেহরিক-ই-তালেবানের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়, মাদ্রাসা ও মসজিদে সভা সমাবেশ করে মৌলবাদের প্রসার ঘটাচ্ছেন।

গত ১৭ মে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ-পাকিস্তান শিক্ষা মেলা। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, গত বছরের ৩০ নভেম্বর প্রথমবার বাংলাদেশ-পাকিস্তান শিক্ষা মেলা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষা মেলায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার বলেছেন, ‘এই উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গেও আমার আলোচনা হয়েছে এবং তিনি উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।’ শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে আগ্রহী। আমরা বিশ্বাস করি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও একাডেমিক কার্যক্রমে বৈশ্বিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদেরও মন জয় করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। সঙ্গে চলছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও বিকৃত করার চেষ্টাও। শুরু হয়েছে শিক্ষা-বিনিময়ের নামে শিক্ষার্থীদের মগজধোলাই।

ইতিহাসকে অবজ্ঞা করে পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবজ্ঞা করে তারা দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপোষ করেছিল। তাদের গৃহীত পথেই বর্তমান সরকারও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নের নামে বাড়তি উৎসাহ দেখানোয় অনেকেই মনে করছেন দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। বিঘ্নিত হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল শান্তিরও। কারণ পাকিস্তানকে কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতার করার অর্থই হচ্ছে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে আপোষ।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD