জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের পুলিশের একমাত্র অবশিষ্ট কনটিনজেন্টকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রায় ১৮০ সদস্যের এই কনটিনজেন্টে রয়েছেন ৭০ জন নারী পুলিশ কর্মকর্তা। আগামী নভেম্বরের মধ্যে তারা দেশে ফেরার কথা রয়েছে। মাত্র দুই মাস আগে এই ইউনিটের অংশ হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সর্ব-মহিলা পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের সদস্যসংখ্যা ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুরো কনটিনজেন্ট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই গৃহীত হয়েছে। অন্যদিকে ক্যামেরুন, সেনেগাল ও মিশরের ইউনিটগুলো আংশিকভাবে হ্রাস করা হবে।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ পুলিশ উভয় সূত্রই নিশ্চিত করেছে, মূলত জাতিসংঘের চলমান বাজেট ঘাটতি ও ব্যয় সংকোচন নীতির কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, “জাতিসংঘের কঙ্গো মিশনের পুলিশ কমিশনার আমাদের ইউনিট কমান্ডারকে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। এখনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। আমরা সব সময় দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেছি—তাই এই সিদ্ধান্ত হতাশাজনক।”
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) শাহাদত হোসেন।
তবে জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রভাবের ঘাটতিকে তুলে ধরে। তার মতে, “জাতিসংঘ সাধারণত সদস্য কমায় ধাপে ধাপে। কিন্তু পুরো কনটিনজেন্ট প্রত্যাহারের নির্দেশ বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক। সরকারের উচিত ছিল কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় যাওয়া।”
সূত্রমতে, ২০ অক্টোবরের মধ্যে প্রথম ধাপে ১৬২ জন সদস্য দেশে ফিরবেন এবং বাকি ১৮ জন প্রশাসনিক কাজ শেষ করে নভেম্বরের মাঝামাঝি প্রত্যাবাসিত হবেন। আগস্টে কঙ্গোতে পৌঁছানো এই ইউনিট সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করে; মাত্র এক মাস পরই তাদের ফেরার নির্দেশ আসে।
২০০৫ সাল থেকে কঙ্গোতে বাংলাদেশ পুলিশের নারী এফপিইউ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছে। চলতি বছরের আগস্টে এই ইউনিটের মেডেল প্যারেডে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন—যা ছিল তাদের কর্মদক্ষতার এক স্বীকৃতি।
অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, এটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অর্জনে বড় আঘাত। একজন কর্মকর্তা বলেন, “তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই ইউনিট দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে। এখন সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ না থাকলে এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, যা জাতির মর্যাদার জন্য বড় ক্ষতি।”
এক নারী সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশের নারী এফপিইউ শুধু পুলিশের অর্জন নয়—এটি জাতীয় গর্বের প্রতীক। এখনই সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”
১৯৮৯ সালে নামিবিয়ায় প্রথম শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশ এখন পর্যন্ত ২৪টি দেশে ২৬টি মিশনে কাজ করেছে। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তা জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও মধ্য আফ্রিকা উল্লেখযোগ্য।