সম্পাদকীয়: আজ ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস। দিনটি কেবল একটি পরিবেশ সচেতনতা দিবস নয়; এটি আসলে মানবজাতির টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষা দেয় ওজোন স্তর। অথচ মানুষের অবহেলা, ভোগবাদী প্রযুক্তি এবং অযৌক্তিক ভোক্তাচর্চার কারণে একসময় এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল।
১৯৮৭ সালের এই দিনে স্বাক্ষরিত হয়েছিল মন্ট্রিল প্রটোকল, যা ইতিহাসে অন্যতম সফল পরিবেশ-সুরক্ষা চুক্তি হিসেবে বিবেচিত। ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় গৃহীত এই চুক্তির মাধ্যমে ওজোন ধ্বংসকারী পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলেই ওজোন স্তরের ক্ষয় থেমে গেছে এবং ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রটোকলের তিন দশক পরে ওজোন ক্ষয় বন্ধ হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তবে হুমকি এখনও কাটেনি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন—ওজোন ধ্বংসকারী গ্যাসগুলির প্রভাব আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এর অর্থ হলো, আমাদের আত্মতুষ্টি নয়; বরং আরও সতর্কতা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বছরের প্রতিপাদ্য—“পৃথিবীতে জীবনের সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতা”—আমাদেরকে একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়। পরিবেশ রক্ষার লড়াই কোনো একক দেশের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির যৌথ দায়িত্ব। উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, প্রযুক্তি বিনিময়, গবেষণা, এবং টেকসই উৎপাদন-ভোগের নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষার পথ সুদৃঢ় করতে হবে।
বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে এই বার্তাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব—এসব সংকট মোকাবিলা করতে হলে ওজোন স্তর সুরক্ষার পাশাপাশি সার্বিক পরিবেশ নীতি গ্রহণ জরুরি।
বিশ্ব ওজোন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়: প্রকৃতি আমাদের শত্রু নয়, বরং সহচর। আমরা যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করি, তবে শেষ পর্যন্ত আমরাই ধ্বংস হব। আর যদি প্রকৃতিকে রক্ষা করি, তবে প্রকৃতি আমাদের রক্ষা করবে।
অতএব, ওজোন স্তর রক্ষার এই বৈশ্বিক আন্দোলনে প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি সবাইকে টেকসই জীবনধারা গ্রহণ করতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও সুস্থ পৃথিবী পায়।