শিরোনাম :
দুর্গাপূজায় বাংলাদেশি ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে ভারতের ব্যবসায়ীদের চিঠি ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধন, তরুণদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষায় সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধন: আইনমন্ত্রী সার ব্যবস্থাপনা তদারকিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুম চালু সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো চিফ পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার সম্পাদকীয় :মাদকের আগ্রাসন রুখতে চাই সামাজিক প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক কঠোরতা সব জেলায় বিনামূল্যে এআই প্রশিক্ষণ দেবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বাকস্বাধীনতা থাকলেও তা যেন বাকশালীনতার সীমা অতিক্রম না করে : প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি ১,৪৯২ বিডিআর সদস্যদের পুনর্বহালের সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সম্পাদকীয় :মাদকের আগ্রাসন রুখতে চাই সামাজিক প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক কঠোরতা

সম্পাদকীয় :
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মাদক একটি সমাজের নীরব ঘাতক। এটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকে ধ্বংস করে না; ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিতকেও দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রামগঞ্জে মাদকের বিস্তার আজ গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিপথগামী হচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ। মাদকাসক্তির কারণে বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অবক্ষয়। এমন পরিস্থিতিতে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু বড় শহর কিংবা নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে মফস্বল শহর, গ্রামগঞ্জ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ এবং বিভিন্ন জনপদে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাদকদ্রব্যের ধরন ও প্রাপ্যতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাব সর্বত্রই ভয়াবহ। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়লে তা একটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মাদকাসক্তি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি মাদক গ্রহণের ফলে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, নষ্ট হয় কর্মক্ষমতা, ভেঙে পড়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ। অনেক ক্ষেত্রে মাদক সংগ্রহের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে মানুষ চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজেও চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা থাকা একজন মানুষ। তাকে কেবল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মাদকদ্রব্যের সরবরাহ ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে? দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক সংস্থাও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের পাশাপাশি মাদকের মূল উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, চোরাচালান, স্থানীয় মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক এবং অর্থের প্রবাহের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

শুধু খুচরা বিক্রেতা কিংবা মাদক বহনকারীকে গ্রেপ্তার করে অভিযান শেষ করলে চলবে না। মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা অর্থদাতা, সরবরাহকারী, চোরাচালানকারী ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা যেন আইনের প্রয়োগে কোনো বিশেষ সুবিধা না দেয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

মাদকের আগ্রাসন রোধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা দুর্বলতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও মাদক পাচারের সম্ভাব্য রুটগুলোতে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি শহর ও গ্রাম—সব এলাকাতেই স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরকে এই প্রতিরোধে যুক্ত হতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আচরণ, বন্ধুমহল ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সন্তানকে ভয় দেখিয়ে নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী সচেতনতা, জীবনদক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন, সাংস্কৃতিক চর্চা, ক্রীড়া ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাড়া-মহল্লা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় নাগরিকদের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে তথ্য দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেন ভয়ভীতি, প্রতিশোধ কিংবা হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসা মানুষের অভিজ্ঞতা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে।

মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাদকনির্ভরতা একটি গুরুতর স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সমস্যা। তাই চিকিৎসাসেবা, কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভাবে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি বারবার একই সমস্যায় ফিরে যেতে পারেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

মাদকের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের শাসন, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। অবৈধ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং মাদকাসক্তদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এই দুই দিককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি দিয়ে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের একটি বড় অংশ যদি মাদকের আগ্রাসনে হারিয়ে যায়, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে কোনো সাময়িক অভিযান কিংবা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, সামাজিক অঙ্গীকার এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ।

মাদকের বিরুদ্ধে এখনই সর্বাত্মক সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শহর থেকে গ্রামগঞ্জ—কোথাও মাদক ব্যবসার নিরাপদ আশ্রয় যেন তৈরি না হয়। প্রশাসনের কঠোরতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, পরিবারের সচেতনতা এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই নীরব ঘাতকের বিস্তার রোধ করতে।

একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকেই। জনগণের প্রত্যাশা—সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কথার চেয়ে কাজে বেশি দৃঢ়তা দেখাবে এবং আগামী প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষায় কার্যকর, দৃশ্যমান ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD