ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো বা সরকারি সেবাকে ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ে আসা নয়; বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সমন্বিত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করে নাগরিকদের উন্নত জনসেবা নিশ্চিত করা—এমন মন্তব্য করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ‘E-ffective e-governance: Accelerating e-government and digital public services in Bangladesh’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
জাতীয় ডেটা গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল রূপান্তর এবং National Responsible Data Exchange (NRDEX) Platform নিয়ে আয়োজিত এ সেমিনারের আয়োজন করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। ই-গভর্ন্যান্স একাডেমির (eGA) সহযোগিতায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের Global Gateway Initiative-এর অর্থায়নে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রী বলেন, শুধু বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করলেই একটি কার্যকর ডিজিটাল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। একই তথ্য নাগরিকদের কাছ থেকে বারবার সংগ্রহ করা কিংবা একই ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পৃথকভাবে তৈরি করার পরিবর্তে Common Capability, Interoperability এবং National Data Exchange ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। নাগরিকের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করাই ডিজিটাল রূপান্তরের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার একটি সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে। নাগরিকদের কাছ থেকে একই তথ্য বারবার নেওয়ার পরিবর্তে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপদ, অনুমোদিত ও দায়িত্বশীল তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইন্টারঅপারেবিলিটি কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে সুশাসন, অভিন্ন মানদণ্ড, জবাবদিহিতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও জড়িত। তাই একই ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা বারবার তৈরি না করে অভিন্ন অবকাঠামো এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় অবশ্যই নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় হতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রকল্পে পুনরাবৃত্তি কমিয়ে এমন জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ব্যবহার করতে পারে।
নাগরিকের দৃষ্টিতে সরকার কোনো বিচ্ছিন্ন মন্ত্রণালয় বা পৃথক ডাটাবেজ নয় উল্লেখ করে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকার মূলত একটি সমন্বিত সেবা ব্যবস্থা। সে কারণে সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থাগুলোকে একটি Connected Ecosystem হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি সেবার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকের আস্থাও অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ডেটা ব্যবস্থাপনা, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং নিরাপদ তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকারের পাঁচটি অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো—আইন ও নীতিমালা, নিরাপদ কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনশক্তি, পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। শক্তিশালী DPI, নিরাপদ ডেটা এক্সচেঞ্জ এবং উন্মুক্ত API নিশ্চিত করে দেশের তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি স্টার্টআপ খাতে প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, সঠিক নীতি, দক্ষ জনশক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করা সম্ভব।
সেমিনারে সমন্বিত ডিজিটাল রূপান্তর, ডিজিটাল সরকারের ক্ষেত্রে ডেটার মালিকানা, দায়িত্বশীলতা ও আস্থা এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের ভিশন ও কৌশলগত অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশস্থ প্রতিনিধি দলের Head of Unit ও Head of Cooperation মাইকেল ক্রেইজা, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ও e-ffective e-governance প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নাহিদ সুলতানা মল্লিক, e-Governance Academy Management Board-এর সদস্য ইনগ্রিড টুনেকুর্গ, eGA-এর Head of Digital Architecture and Solutions Competence Centre আরভো অট, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিব ফারাহ শাম্মী এনডিসি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ