ঢাকা, ২৪ আগস্ট ২০২৬: চালক ও পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানো, কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এম
সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের (BRSP) আওতায় সড়ক দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং মহাসড়কে টহল কার্যক্রম জোরদারে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স এবং ৮০টি হাইওয়ে প্যাট্রোল মোটরসাইকেল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি রোধে সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শুধু দুর্ঘটনা কমানোই নয়, দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ জন্য মহাসড়কে দ্রুত জরুরি সেবা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তায় নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত নতুন নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি মহাসড়কসংলগ্ন বাজার স্থানান্তর, আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থলে প্রয়োজনীয় ডাইভারশন নির্মাণ এবং সড়কে স্পষ্ট মার্কিং ও সাইনেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ ও অযোগ্য চালক, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা এবং পথচারীদের অসচেতনতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের অনেক চালক পরিবহন খাতে হেলপার হিসেবে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে গাড়ি চালানো শিখেছেন। কিন্তু শুধু গাড়ি চালাতে পারলেই একজন চালক দক্ষ হয়ে ওঠেন না। মহাসড়কে নিরাপদে ও নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় চালকদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উদ্বোধন করা অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে। মহাসড়কের পাশে থাকা হাসপাতালগুলোতে আলাদা ইউনিট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি ১০ কিলোমিটারের মধ্যে একটি করে অ্যাম্বুলেন্স রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ট্রমা সেন্টারগুলোও সচল করার উদ্যোগের কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আহত ব্যক্তিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তা ও সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের প্রতিটি টাকা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার কাজে কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হবে। জনগণের অর্থ ব্যয় করে এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না, যার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।
তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলে নিরাপদ সড়কের জন্য নেওয়া সামগ্রিক প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, এমপি বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আজকের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। গাড়ির গতি যেন মানুষের জীবনের গতি থামিয়ে না দেয়, সে লক্ষ্যেই দুর্ঘটনার পর দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার সড়ককে আরও নিরাপদ করার পাশাপাশি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার গতিও বাড়াতে চায়। তবে এ দুটি লক্ষ্য সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নিরাপদ, বাসযোগ্য ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, এমপি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বৃহত্তর পরিসরে একটি কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের সার্বিক সাফল্য কামনা করেন তিনি।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প দেশের প্রথম বহুখাতভিত্তিক এবং ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-ভিত্তিক উদ্যোগ। প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স জয়দেবপুর-হাটিকামরুল-বগুড়া-রংপুর, হাটিকামরুল-নাটোর-রাজশাহী এবং জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কের প্রতি ১০ কিলোমিটারে একটি করে মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি হাইওয়ে টহল কার্যক্রম জোরদারে ৮০টি প্যাট্রোল মোটরসাইকেল এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান ডিভিশনের পরিচালক জ্যঁ পেম (Jean Pesme) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান।
সূত্র: সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।